Article
অতিজীবিত সময়
শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন
|
অতিজীবিত সময়

শৈশব

হাওরপারে আমার জন্ম- সুনাগঞ্জের জয়শ্রী-তে। প্রায় ৩৭ বছর আগে। সে-সময়টায় বাঊল শাহ করিম সম্ভবত ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ লেখেননি। হিন্দু-মুসলমান, জারি-সারি-মুর্শিদী আর বাউল গানে একাকার হয়ে চলছিল আমাদের হাওরপারের মানুষের জীবন।
হাওরপারের মানুষের জীবনধারা আলাদা- ছ’মাস পানি আর ছ’মাস বোরো ধান ফলনের চক্রে বহতা-সংস্কৃতি বৈশাখে ধান গোলায় উঠাতে না উঠাতেই চারদিক থৈ থৈ জল। শুরু হত ছ’মাসের জল-ঘেরা জীবন!
আমার এখন যা বয়স, সে-বয়সে অনেককেই দেখতাম গলায় গামছা আর ফুল- ভল্যুম রেডিও হাতে নিয়ে এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে। রেডিও’র আওয়াজ শুনেই আমরা ছোটরা বলে দিতে পারতাম বাড়ির সামনে দিয়ে কে হেঁটে যায়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তাস খেলা আর বিকালে বা রাতে মাছ ধরা ছিল তাদের অন্যতম প্রধান কাজ। সে সময়টায় মাছ ধরাটা ছিল একটা উৎসবের মতো ব্যাপার। বেড়জাল, কারেন্টের জাল তখনও চালু হয়নি। দড়া-টানা, খাজামারা, আউল্লোরা- এইসব পদ্ধতিতে মাছ ধরায় তাদের একেক জন ছিলেন বিরাট উস্তাদ। ছ’মাসের জল-ঘেরা সময়ে হাট থেকে মাছ কিনে আনা হয়েছে বলে কখনও দেখিনি বা শুনিনি।
তারা আরেকটি কাজ করতেন। গ্রামে গ্রামে প্রতিযোগিতা দিয়ে বই করতেন-হেরা রহিম বাদশা লামাইতেছে। আম্রা কি মুছে তা দিমু? ল, আমরা সিরাজদুল্লা লামাই।
প্রতি সন্ধ্যায় হ্যাজাক জ্বালিয়ে তারা বইয়ের রিহার্সেল করতেন। অভিনেতা থেকে প্রমোটারের গলার জোর সব সময় বেশি হত। বার বার প্রমোটার বলে দেওয়াার পরেও অভিনেতা ঠিকঠাক বলতে পারতেন না। কিন্তু পরদিন রেডিও হাতে পাড়ায় এমনভাবে বুক ফুলিয়ে হাঁটতেন যেন তিনিই বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার আসল নবাব।

বাক্সের বায়োস্কোপ তখন উঠে গেছে। জল-ঘেরা ছ’মাসের আমাদের (ছোটদের) প্রধান বিনোদন ছিল গোল্লাছুট আর মার্বেল। প্রত্যেক পাড়ায় বড় উঠানওলা একটি বা দু’টি বাড়ি থাকত। বড়োদের চোখ এড়িয়ে আমরা সে-উঠানে গোল্লাছুট খেলতাম। অবধারিতভাবে খেলা শুরু হবার ২০ মিনিটের মাথায় বড়দের কেউ না কেউ বেত নিয়ে আজরাইল বেশে উদয় হতেন, এবং আমরা তখন ফরিঙের মত একেকজন একেকদিকে দৌঁড়…
বেশির ভাগ সময় এই বড়োদের দলে থাকতেন মাস্টার অথবা মসজিদের হুজুর গোত্রের কেউ। তাঁরা আসতেন উজান থেকে। পাড়ায় কারও বাড়িতে লজিং থাকতেন- বৌ-পরিজন ছাড়া এবং চারদিকে জল-বেষ্টিত থেকে থেকে আমাদের সাইজ করার নানান কৌশল বের করাই তাঁদের মেইন কাজ হয়ে দাঁড়াত।

মার্বেল খেলায় বড় উঠান লাগত না। এই খেলা হত চিপায় চাপায়। এর পরেও ঐ গোত্রের কেউ না কেউ সেখানে গিয়েও উদয় হতেন। শকুন। সাক্ষাৎ শকুন। ছোঁ মেরে দানের সবগুলো মার্বেল হাতের মুঠিতে নিয়ে এক ঢিলে বাড়ির সামনের জলে বিসর্জন দিতেন আর বেত তেড়ে তেড়ে বলতেন- হারামজাদার দল, আবার শুরু করছছ? দাড়া এইবার দেখাইতাছি। আমরা যে-যেদিকে পারতাম চোখ বুজে দৌঁড়…
আমাদের আরেকটি কাজ ছিল দীর্ঘ সময় ধরে সাঁতার কাটা। চারদিকে খোলা জল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা টানা সাঁতার কেটে যেতাম। কোনও কোনওদিন বেত নিয়ে আবার কেউ তেড়ে না আসলে আমাদের এই সাঁতার দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকত। সাঁতারে নেমে আমাদের প্রিয় একটি খেলা ছিলো -লাই খেলা। সাঁতার কেটে, ডুব দিয়ে দিয়ে যেভাবেই হোক একজন আরেকজনকে ছুঁয়ে দেওয়া। যাকে ছুঁয়ে দেওয়া হবে তার কাজ হবে আরেকজনকে ছুঁড়ে দেওয়া।
আমার পুরো শৈশবটাই কেটেছে এমন উদ্দাম পরিবেশে। চারদিকে খোলা আকাশ, থৈ থৈ জল, জলের ঢেউ, বাতাস। হাওরের খোলা বাতাস। কোনো কিছুর অভাব ছিলো না। বাড়ির উঠানে বসে শৈশবে দেখে আসা ভরা পূর্ণিমার বিশাল রূপালি চাঁদ, হাওরের জলে সেই চাঁদের ছবি… চোখে লেগে আছে।
পৃথিবীর নানা দেশে আমি ঘুরেছি, জোছনার এমন মায়াময় রূপ এখন পর্যন্ত আর কোথাও চোখে পড়েনি।

মা


ছেলে মাকে বলে, আমি যুদ্ধে যাব। মা তাকে অনুমতি দেন। ছেলে যুদ্ধে যায়। যুদ্ধে বন্দি হয়।
এই মাকে পাকিস্তানীদের পক্ষ থেকে বলা হয় যদি সাথের সব গেরিলা যোদ্ধাদের নাম-ধাম তাঁর ছেলে বলে দেয়, তবে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
মা ছেলের সাথে দেখা করেন। ছেলে বলে মা, ওরা খুব মারে। সব কথা বলতে বলে। মা ছেলেকে বলেন, মারের সময় শক্ত হয়ে থেকো বাবা। কারও নাম বলে দিও না। ছেলে বলে, মা দুদিন ভাত খাই না, ভাত নিয়ে এসো। মা পরের দিন ভাত নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু ছেলের সাথে তাঁর দেখা হয়নি। পরে আর কোন দিন দেখা হয়নি।
এই ছেলে তাঁর মায়ের কাছে ফিরে আর আসেনি।
ছেলেকে ভাত খাওয়াতে পারেন নি এই অপরাধে সেই মা জীবনের কোন দিন ভাত মুখে নেননি।
নিজ সন্তান এবং হাজারও বীর শহীদ সন্তানের লাশ যে মাটির নীচে শুয়ে আছে, শহীদ সন্তানদের অসম্মান করা হবে বলে সে মাটির উপর দিয়ে সেই মা আমৃত্যু খালি পায়ে হেঁটেছেন।
(এই মাকে আমরা সবাই চিনি। মোসাম্মৎ সাফিয়া বেগম, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আজাদের মা – শহীদ রুমী, বদি, আলতাফ মাহমুদ, জুয়েলের প্রিয় খালা।)


তুই বাড়ীত আইস না, বাবা। আইয়া কি করবি? দেখস না বাড়িত কত ঝামেলা। তুই দূরে আসস ভালা আছস। বাড়িত আইবে আর হেরা তোরে ঝামেলায় ঢুকাইয়া দিবো। তোর আওয়নের দরকার নেই।
ঈদে বাড়ি আসতে নিষেধ করে এক মা দরিদ্র পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া সন্তানকে টেলিফোনে উপরের কথাগুলো বলেছেন।


কেমন আছস, মা? তুই খাইসস? আজ তোরা কি রানসস? তোর পেটে বেথাডা কমছে?
মারে, সাবধানে থাকিস। অপরিচিত কাউর সাথে মিশিস না। কোন কিছু লাগলে তুই আমারে ফোন দিস, তোর বাপরে বলিস না। না দিতে পারলে খুব কষ্ট পায়। বুঝস না, আম্রার টানাটানির সংসার।
এটি ইউনিভার্সিটির হলে থাকা এক মেয়ে আর তার মায়ের টেলিফোন কথোপকথনের অংশ।


কতোদিন দেহিনা তোমায়, তুমি ভালা আছ বাজান? এইবার আইবা না? দেখ, ব্যাবস্থা কৈরা আইয়া যাও? আর কয়দিন বাঁচি, ঠিক নাই, তোমারে দেখতে মন চায়। তোমার বাচ্চাদের দেখতে খুব মন কান্দে।
বিদেশে বসবাসরত এক ছেলের সাথে মায়ের কথোপকথন।


কৈ যাবেন, খালা?
– সিলট।
গ্রামে গেছিলাইন?
– অয়। আমার ছোট ছেলে বিদেশ থেকে আইছে। তার ছেলে মেয়ে সহ আমারে দেখতে আইছে। ভার্সিটিতে কাজ করে। গ্রামে গেছিলাম। সবাইরে দেখাইয়া নিয়া আইলাম। হে পিএইচডি করার পরেতো আর গ্রামে যায়নি, এইবার তার বৌ বাচ্চাকেও দেখাইয়া নিয়া আইলাম। তোমরা আমার ছেলের জন্য দোয়া কর।
বিদেশফেরত এক ছেলে অবাক হয়ে তার ৭০ বছর বৃদ্ধ মায়ের গর্বভরা উচ্ছাস দেখছে। গ্রামের বাজার। বাস স্ট্যান্ডের ফার্মেসির সামনে বাসের জন্য অপেক্ষারত তারা। ফার্মেসির মালিকের কাছে ছেলেকে নিয়ে এভাবেই গর্ব করছেন এক মা।

(শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক লেখায় পড়েছিলাম – তাঁর মাকে নিয়ে কলকাতায় সিনেমা দেখার একটি ঘটনা তিনি বলছিলেন। ছবিতে প্রভাদেবী মা। তাঁর ছেলে, জহর রায়। প্রভাদেবী কার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছেন। তাই পুলিশ এসেছে তদন্ত করতে। তখন জহর বলছেন, আমার মা সব পারে। এই দৃশ্যে তাঁর মা আর বসে থাকতে পারলেন না। ভয়ঙ্কর দুশ্চিন্তায় উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন। হলের অন্ধকারের ভেতর দিয়ে তিনি তাঁর মাকে নিয়ে বেড়িয়ে আসতে হলো । বাড়ি এসে ডাক্তার ডাকতে হলো। ডাক্তার মেপে বললেন, ব্লাড প্রেসার বেড়ে গেছে।)
-মায়েরা তো এমনই।

জোছনা ও জননীর গল্প


দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়ায় আমার সবচেয়ে বড় যে-ক্ষতিটা হয়েছে তা হল বাংলা বই পড়া থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছি।
কেউ দূরে সরিয়ে দেয়নি। এমনি থেকেই সরে যেতে হয়েছে। বহু কারণের মাঝে পর্যাপ্ত বাংলা বই না পাওয়া একটা কারণ। বাংলাদেশে যেটা ঘর থেকে বের হয়েই পাওয়া যায় এখানে সেটাকে উড়োজাহাজে উড়িয়ে আনতে হয়!
এই কয় বছরে কত বই যে বেরিয়ে গেছে, তার টেরই পাইনি!
প্রতিবছর বইমেলা আসে। অনলাইনে প্রিয় লেখকদের বইয়ের নামগুলো পড়া, মলাট দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না!
গত বারো বছরে কিছুই পড়া হয়নি !
‘জোছনা ও জননীর গল্প’ – এই বইটি না পড়লে কত বড় ক্ষতি হয়ে যেত!
ক’দিন থেকে পড়ছি! কতদিন পরে সবকিছু ভুলে কিছু একটা করা হচ্ছে (বারো বছর পরে মুগ্ধ হয়ে কিছু একটা পড়ছি- সেটা আবার মুক্তিযুদ্ধের গল্প)। স্বাধীনতার এতোগুলো বছরের পরে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভেতরে হাঁটছি- মার্চের উত্তাল দিলগুলো, ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ডাক, দেশব্যাপী গেরিলা যুদ্ধের খ-চিত্র, রাজাকারদের তা-ব, হানাদার বাহিনীর পাশবিক ধ্বংসলীলা- চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছিলো।
হুমায়ূন আহমেদ- তোমার কাছে বাঙালি জাতি অনেক কারণে ঋণী- এই বইটি সে ঋণ আরোও কয়েক হাজার গুণ ভারি করে দিল।


আমি খুব ভীতু এবং আবেগপ্রবণ মানুষ।
এই দূর্বল চিত্ত আর আবেগ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কোন লেখা, ছবি, বা নাটক কোনটাই আমার পড়া বা দেখা উচিত নয়।
একেকটা লেখা পড়ি, একেকটা ছবি দেখি রাগে অপমানে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে স্থির করি-আর না। এটাই শেষ। মুক্তিযুদ্ধের আর কিছু পড়ব না, দেখবও না।
‘আগুণের পরশমণি’ দেখে সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে মনে হয়েছিল চোখের সামনে যদি একটা রাজাকার পেতাম তাহলে হাতের কাছে যা পাব তা দিয়েই পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে ছাড়তাম।
‘জোছনা ও জননীর গল্প’ পড়তে পড়তে কতবার যে মন অস্থির হয়ে উঠেছিলো !
কত ঘটনা !
একটা ঘটনা মনে ভীষণভাবে গেঁথে গেছে। অনেক জায়গায় এটা শুনেছি, আজ ‘জোছনা ও জননীর গল্প’তেও পড়লাম- ‘১৬ই ডিসেম্বরের সকাল। কাদের সিদ্দিকীকে সাথে নিয়ে (ইন্ডিয়ান) জেনারেল নাগরা পাকিস্তান ইস্টার্ণ কমান্ডের হেড কোয়ার্টারে গেলেন। তাঁরা দু’জন ঘরে ঢুকলেন। নিয়াজী জেনারেল নাগরার পূর্ব পরিচিত। কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে জেনারেল নাগরা ঘরে ঢুকামাত্র নিয়াজী নাগরার সাথে করমর্দন করলেন। অপমানে দুঃখে নিয়াজী জেনারেল নাগরার কাঁধে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। নিয়াজীর ফোঁপানো একটু থামতেই জেনারেল নাগরা তাঁর পাশে দাঁড়ানো মানুষটির সঙ্গে নিয়াজীর পরিচয় করিয়ে দিলেন। শান্ত গলায় হাসি হাসি মুখে বললেন, এই হচ্ছে সেই টাইগার সিদ্দিকী।
জেনারেল নিয়াজী অবাক হয়ে দীর্ঘসময় তাকিয়ে থাকলেন কাদের সিদ্দিকীর দিকে। তাদের স্তম্ভিতভাব কাটতে সময় লাগল। এক সময় নিয়াজী তার হাত বাড়িয়ে দিলেন কাদের সিদ্দিকীর দিকে।
কাদের সিদ্দিকী হাত বাড়ালেন না। তিনি সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইংরেজীতে বললেন, নারী এবং শিশু হত্যাকারীদের সঙ্গে আমি করমর্দন করি না।”
আরেকটি বিষয়ে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমি একমত। বিষয়টি নিয়ে আমি অনেকবার ভেবেছি। একসময় অনেক ডাটাও সংগ্রহ করেছিলাম।
মাওলানা ইরতাজুদ্দীন কাশেমপুরী চরিত্রটি। আমি এই চরিত্রটির মত অনেকের কথা শুনেছি। তাঁরা মনে প্রাণে পাকিস্তান সাপোর্ট করত। কারণ তাঁদের ধারণা ছিল পাকিস্তানীরা খাঁটি মুসলমান। ওরা মানুষ মারে না, ওরা নবীজীর আদর্শ মেনে চলে, ওরা মা বোনদের ইজ্জত দিয়ে কথা বলে, ওরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। মোটকথা, খাঁটি মুসলমানের সব গুণাগুণ এদের মাঝে আছে। কিন্তু যেই মুহূর্তে ইরতাজুদ্দীনরা চাক্ষুস দেখল পাকিস্তানী মিলিটারীরা সাক্ষাৎ যম, রক্তপিপাসু পশু, নারীলোভী উন্মাদ- সেই মুহূর্তে মৃত্যুকে নিশ্চিত জেনেও তাঁরা এই জানোয়ারদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। ঘৃণার থু থু ছিটিয়েছেন। মৃত্যুকে হাসি মুখে বরণ করেছেন।
আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম…
আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম – বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের (আমাদের প্রিয় করিম ভাইয়ের) বহুল প্রচলিত একটি গান।
আমি যতদূর জানি প্রথমে হাবিব ওয়াহিদ এবং পরবর্তিতে আরো অনেকে এই গানটির রিমিক্স করেছেন, গেয়েছেন। শাহ আব্দুল করিমের অসংখ্য জনপ্রিয় গানের মধ্যে এটি দেশে বিদেশে ব্যাপক জনপ্রিয় একটা গান।
আমার কাছে বরাবরেই শাহ আব্দুল করিমের কন্ঠের অরিজিন্যাল গানটিই ভাল লাগে। রিমিক্স শুরু হওয়ার সময় থেকে খেয়াল করলাম (অন্যরা হয়তো আগেই খেয়াল করেছেন) করিম ভাইয়ের কন্ঠের অরিজিন্যাল গানের সাথে বহুল প্রচলিত ভার্সনের লিরিকে অমিল আছে (কোন কোন ভার্সনে কিছু কথাকেই গায়েব করে দেওয়া হয়েছে)।
শাহ আব্দুল করিম যেখানে “আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম, গ্রামেরও নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান আর ঘাটু গান গাইতাম” সেখানে প্রচলিত ভার্সনে “আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম, গ্রামেরও নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদী গাইতাম” করে গাওয়া হয়েছে।
আমি জানি না ইচ্ছাকৃত ভাবে “ঘাটু”গানের জায়গায় “মুর্শিদী”করা হয়েছে কি না (কখনও কখনও আবার ‘সারি গান’ও বলা হয়েছে)?
এই পরিবর্তনে আমার কোন সমস্যা নেই। সমস্যা হল এই গানিটি একটি সময়কে ধারণ করে টিকে আছে, এবং অনেক বছর টিকে থাকবে। তাহলে এটি কী “ঘাটু” গানকে এড়িয়ে চলা? কিন্তু সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা এবং পুরো ভাটি অঞ্চলেই এই ঘাটু গান এক সময় খুব জনপ্রিয় ছিল। অস্বীকার করার উপায় নেই যে ভাটি অঞ্চলের সৌখিন জমিদারেরাদের মনোরঞ্জনের জন্য জমিদারদের সময়ে ঘাটু প্রথাও চালু ছিল।
গানটি ব্যাপক বিস্তৃতির সময়টায় শাহ আব্দুল করিম বেঁচে ছিলেন। আমি নিশ্চিত তিনিও এটা খেয়াল করেছেন। উনার অভিমত কি ছিল আমি জানি না, তবে আমি মনে করি শাহ আব্দুল করিমের অরিজিন্যাল লিরিকটাই রাখা উচিত।

ঈদ ও পূজা

১ কুরবানীর ঈদ
আমার শৈশবে জয়শ্রীতে প্রতিটি ঈদ আসতো আনাবিল আনন্দ নিয়ে।
২৯ বা ৩০ বছর আগের কথা। আমি তখন ২য় বা ৩য় শ্রেণীতে বই খাতা নিয়ে যাওয়া আসা করি। কুরবানীর ঈদ হতো শেষ বর্ষায়। আশ্বিনে। তখনও জয়শ্রীর চারদিকে পানি থাকতো।
ঈদের সকাল শুরু হতো মহা ধুমধামে। হৈ হৈ একটা ব্যাপার হতো। খুব সকালে দলবেঁধে আমরা বাড়ির ঘাটে গোসলে নামতাম। বাঁশ দিয়ে বাধাঁনো ঘাট। নতুন কাপড় পড়ে আমরা ছোটরা এবাড়ি ওবাড়ি করতাম। বড়োরা তৈরী হওয়ার অনেক আগেই নৌকায় উঠে বসে থাকতাম।
আমরা ছোট ছোট নৌকায় করে মসজিদে যেতাম। দুই তিন বাড়ির ছোট বড়ো সবাই এক নৌকাতে যেতো। বড়োদের কারও পড়নে নতুন, কারও পুরাতন পাঞ্জাবি। জয়শ্রী বাজারের পার্মানেন্ট ইস্ত্রিওয়ালা হেমেন্দ্র। তাঁর কল্যাণে পুরাতন অনেকের পাঞ্জাবী নতুনগুলো থেকে বেশি চকচক করতো।
প্রতি বাড়ি থেকে অন্তত একজনের বগলের নিচে একটা পাটি থাকতো। জায়নামাজ তখনও চালু হয়নি। নৌকায় বড়োরা দাঁড়িয়ে থাকতো, অকারণে আমাদের মতো ছোটদের ধমকাতো- এই থালডা দিয়া ফানিডা পিচ। চুপ মাইরা বইরা থাক। একটুও লরিস না।
তাঁদের কাপড় থেকে ভুর ভুর করে সস্তা আতরের ঘ্রাণ আসতো।
ঈদগা মাঠে আমাদের মতো ছোটদের প্রধান কাজ হতো বড়োদের জুতা হাতে মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। অপ্রধান কাজ ছিলো অকারণে চিল্লাচিল্লি এবং মারামারি করা। আমাদের কাছে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ছিলো রুকু এবং সিজদায় সবাই যখন কাতার করে উঠানামা করতো। কি অপূর্ব সুন্দর সে দৃশ্য !
মোনাজাতের পরে বড়োরা যখন কোলাকুলি করতো আমরা তখন ভীড়ের মাঝে তাঁদের খুঁজে বেড়াতাম। তাঁদের জুতা বুঝিয়ে দিয়ে দৌড়ে নৌকায় উঠতে হতো।
সব নৌকা একসাথে যখন ঈদগা থেকে ছেড়ে যেতো, সে এক দেখার মতো দৃশ্য হতো! যেন একটা পাঞ্জাবি-টুপি মেলা। চারদিকে শুধু নৌকা আর নৌকা। শত শত মানুষ পাঞ্জাবি টুপি পড়ে নৌকা মেলায় এসেছে। মেলা শেষ এখন তারা বাড়ি ফিরছে।
কুরবানীর গোস্তের ভাগ প্রতি ঘরে ঘরে দেওয়া হতো। ছোট ছোট ভাগ। প্রতিটি ভাগে দুইটি, বড়োজোড় তিনটি গোস্তের টুকরো থাকতো। বড়ো একটা ডালায় করে ভাগগুলো বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হতো। গ্রামের প্রতিটি মুসলিম ঘরে গোস্তের ভাগ পৌঁছে যেতো।
আমরা ছোটরা মহাআনন্দে একটি পাতিলে ভাগের গোস্ত জড়ো করতাম। একেকটি ডালা আসতো আর আমাদের পাতিলে গোস্তের পরিমাণ বাড়তো। এক সময় দেখতাম পুরো পাতিল ভরে উঠেছে ।
পানি-ঘেরা জয়শ্রীতে (আশ্বিনের) কুরবানীর ঈদ করতে খুব ইচ্ছা হয় !

২ রোজার ঈদ
কৈশোরের শুরুতে, ১৯৯০ সালে লেখাপড়ার জন্য সিলেটে চলে যাই। লজিং বাড়িতে থেকে পড়াশুনা করি। আমাদের ভাইদের মাঝে আরো দুইজন তখন সিলেটে থাকতেন। তারাও লজিং থেকে পড়াশুনা করতো।
১৯৯০ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত প্রতি ঈদের আগের দিন আমাদের আম্মা আব্বার চোখ থাকত জয়শ্রী গোদারা ঘাটের দিকে।
আমরা তিন ভাই এক সাথে সিলেট থেকে বাড়ি ফিরতাম।
সে সময় বেশির ভাগ রোজার ঈদ পড়তো চৈত্র-বৈশাখের আগে-পরে। সুরমার সাথে সংযুক্ত বৌলাই নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় তখন সুনামগঞ্জ থেকে লঞ্চ সরাসরি জয়শ্রীতে আসতো না। লক্ষীপুর নেমে আমাদের হেঁটে আসতে হতো।
লক্ষীপুর থেকে নদীর তীর ধরে সুখাইড়। সুখাইড় থেকে হাওরের পথ। ক্ষেতের আল ধরে হাঁটা পথ। প্রচুর কাদা হতো। যেই সেই কাদা না, এঁটেল মাটির কাদা। জোঁকের মতো পায়ে লেগে থাকতো।
কাঁধে ব্যাগ আর হাতে জুতো নিয়ে হাওরের আল ধরে হাঁটতাম। গোধূলির আলোতে হাঁটতে হাঁটতেই ঈদের চাঁদ দেখা হতো। অনেকবার এমনটি হয়েছে। জ্বলজ্বলে সান্ধ্যতারার পাশেই পশ্চিম-আকাশে ঈদের অপূর্ব সুন্দর চাঁদ। দেখে খুব খুশি লাগতো।
খুব মনে পরে সেইসব সময়ের কথা।
আজকের মতো তখন মোবাইল ফোন ছিল না। কোন বলা কওয়াও ছিল না। কিন্তু আব্বা আম্মা ও বাড়ির সবাই জানতো আমরা আসবোই। এমনটিই নিয়ম হয়ে গিয়েছিলো। প্রতি ঈদের আগের রাতে আমরা বাড়ি ফিরতাম। জয়শ্রী গোদারা ঘাটে আব্বা অথবা বাড়ির কেউ টর্চ হাতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করতো।
ঈদের সকালে বাড়ির সামনে বৌলাই নদীতে দলবেঁধে গোসল করতাম। দুই তিন বাড়ির সামনে একটি কমন ঘাট থাকতো। প্রতি ঘাট ভর্তি থাকতো ছেলে বুড়ো শিশুতে। তাড়াতাড়ি গোসল, তারপর একসাথে নামাজে যাওয়ার প্রস্তুতি।
ভাইয়ের সামান্য শিক্ষকতার বা আমাদের টিউশানির জমানো টাকায় আব্বা আম্মা বা বাড়ির ছোট বড় সবার জন্য জামা কিনতাম। সবাই নতুন জামা পেত। সেই জামা পড়ে আমার দুই ভাগ্নি আর এক ভাতিজা বাড়িময় ঘুরঘুর করতো (আর এখন! বাড়ি ভর্তি আমাদের উত্তরসূরীতে। হয়ত জামা কাপড়ও কেনা হয় দেদারছে। কিন্তু ওদের আনন্দ আমার আর দেখা হয় না।)
আমি জানি জয়শ্রীর বৌলাই নদী, পথ-ঘাট – আমার শৈশব কৈশোরের কোন স্মৃতিই মনে রাখেনি, কিন্তু আমার আব্বা আম্মা এখনও প্রতিটি ঈদে আমার জন্য সেই ১৯৯০-০২ সালের মতই অপেক্ষা করেন।
(এখন আর সেই গোধূলিবেলাকে সাথে নিয়ে জয়শ্রীতে যাওয়ার কোন সুযোগ আমার নেই। ঈদের সকালে বৌলাই নদীতে দাপড়িয়ে গোসল করারও সুযোগ নেই। আব্বা আর আমাদের পাঁচ ভাই একসাথে নামাজে যাওয়ারও সুযোগ নেই। কিন্তু আম্মা আব্বা, আমি তোমাদের সাথে নিয়েই ঈদ করি। শুধু ফিজিক্যালি তোমাদের সাথে থাকতে পারি না, এই যা।)

৩ পূজা
তখনও কিশোর হইনি। আমাদের জয়শ্রীর চৌধুরী বাড়ির সেই জৌলুসও তখন আর নেই।
বড়োদের কাছে শুনেছি – চৌধুরীদের প্রায় সবাই জয়শ্রী ছেড়ে, দেশ ছেড়েও চলে গেছেন। তবে সে সময়েও জয়শ্রীতে পূজা হতো। চৌধুরীদের ছায়ায় জেগে উঠা কিছু নব্য প্রভাবশালী পূজা করতো। পূজার পুরো সময়টা হিন্দু মুসলমান একাকার হয়ে থাকতো। মুসলমানদের জন্য আলাদা খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা হতো।
একবার খুব ধুমধাম করে দুর্গা পূজা হয়েছিলো। পাঠা বলি দেবার দৃশ্য এখনও আমার চোখে লেগে আছে। মহালয়ার দিন থেকে বিসর্জনের আগ পর্যন্ত জয়শ্রী একটা উৎসবের গ্রাম হয়ে গিয়েছিলো।
এখনো চোখে ভাসে কৃষ্ণতিল, তুলসী করজোড়ে নিয়ে মন্ত্র পড়তে পড়তে কতো না-চেনা মানুষ দেবীর সামনে প্রণাম করছে। বয়স্কদের কেউ কেউ যতবার দেবীর সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করছে ততবার হাত কপালে তুলে প্রণামের ভঙ্গি করছে। আমি মন্ডপের পাশে দাঁড়িয়ে প্রণাম করা গুণছিলাম। একবার দুইবার করে করে অনেককে পনেরো বিশবার প্রণাম করতে গুণেছি।
সেই বছর হিন্দু পাড়ার সকল তরুণী মেয়েদের পূজা মন্ডপে ঢল নেমেছিলো। এই গ্রামে জন্মেছি, এক সাথে এত তরুণী আগে কখনও এখানে দেখেনি। বেশির ভাগ ছিল আমার বড় আপার বয়েসি। আমার আপার এক দুইজন বান্ধবীও সেখানে ছিল। ওরা এসেছিলো সন্ধ্যার অনেক পরে। দল বেঁধে। দেবীর সামনে ওদের প্রণাম করার দৃশ্যটি হ্যাজেক বাতির আলোকিত আলোতে এতোটাই মোহণীয় ছিল যে পূজা বলতে এখনও আমি আমার বালক বয়সে দেখা এমন মোহণীয়, এমন নিবেদিত প্রণামকেই বুঝি।
বিসর্জনের দিন একটা করুণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিলো। শঙ্খের সুর আর উলুর হাহাকারে চারদিক কেমন যেন ভারী হয়ে উঠেছিলো। সেই পরিবেশকে আরো মাত্রা দিয়েছিলো বৃষ্টি। দেবীকে নৌকার গলুইয়ে বসিয়ে, ঝুম বৃষ্টির মাঝে ঢাক ঢোল করতাল বাজিয়ে বিসর্জনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।
শুনেছি জয়শ্রীতে এখান আর এমন জমকালো পূজা হয় না।


Link: This article was originally published here

Go to Top