Article
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে এসব কী দেখছি
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে আজ অশুভের ছায়া
|
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে এসব কী দেখছি

জগতজ্যোতি দাস বীর বিক্রম। তিনি একাত্তরে সুনামগঞ্জের দুর্গম হাওরাঞ্চলের এক গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা দলের কমান্ডার ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ইলিয়াস, মতিউর, রশিদ, আইয়ুব, বৈষ্ণব, কাজল, সুনীল, নীলু, কাইয়ুমরা একের পর এক শত্রুশিবিরে হানা দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী আর রাজাকারদের ত্রাসে পরিণত হয়েছিলেন। বিজয়ের প্রাক্কালে ১৬ নভেম্বর ১৯৭১ এক সম্মুখ যুদ্ধে শত্রুর গুলিতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছিল জগতজ্যোতির দেহ। তাঁর সহযোগী যোদ্ধা ইলিয়াসও গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। ইলিয়াস তাঁর শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্তের স্রোতকে উপেক্ষা করে, প্রিয় কমান্ডার জগতজ্যোতির নিথর শরীর বিলের কাদাপানির ভেতর যতটা সম্ভব পুঁতে ফেলেছিলেন। যাতে পাকিস্তানি আর রাজাকারেরা প্রিয় কমান্ডারের লাশের অবমাননা করতে না পারে। কিন্তু রাজাকাররা শেষ পর্যন্ত তাঁর লাশ পেয়ে গিয়েছিল, আর সত্কারহীন জগতজ্যোতির ক্ষত-বিক্ষত লাশ ঝুলিয়ে রেখেছিল বাজারের খুঁটিতে।

১৯৭১ সালের ২৯ মার্চের গভীর রাতের আরেকটি ঘটনা শুনুন। সেই রাতে কুমিল্লার এক বাড়ির সামনে পাকিস্তান আর্মির কয়েকটি ট্রাক এসে থেমেছিল। হায়েনার দল সেই বাড়ি থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তাঁর ছেলে দিলীপ দত্তকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পার্শ্ববর্তী ময়নামতি সেনানিবাসে। সেখানেই তাঁদের নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল। এই সেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, যিনি ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদের অধিবেশনের প্রথম দিনেই প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন—উর্দু এবং ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের ভাষা করা হোক। সেদিন এই প্রস্তাবের সরাসরি বিরোধিতা করেছিলেন মুসলিম লীগের খাজা নাজিমুদ্দিন। তীব্র কটাক্ষ এবং বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেছিলেন প্রভাবশালী মন্ত্রী রাজা গজনফর আলী এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। পূর্ব বাংলার অন্যান্য মুসলমান সদস্য মুখে তালা-চাবি এঁটেছিলেন। পরবর্তী ইতিহাস আমাদের সবার জানা। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই সাহসী প্রতিবাদের পথ ধরেই ঢাকার শিক্ষাঙ্গনের সচেতন ছাত্রছাত্রীদের ভেতর প্রতিক্রিয়া শুরু হয়; তাঁরা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলে আন্দোলন শুরু করে।

বাহান্নোর রফিক, সালাম, বরকত থেকে শুরু করে একাত্তরের জাহাঙ্গীর, মতিউরের সঙ্গে শরীরের শেষ ফোঁটা রক্ত দিয়ে গেছেন জগতজ্যোতি, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মতো অসংখ্য অসাম্প্রদায়িক মানুষ। তাই স্বাধীনতার পঁয়তাল্লিশ বছর পরে আজ যখন হিন্দুদের ‘সংখ্যালঘু’ বলা হয় তখন আমাদের বিবেকে বাঁধে। আমরা বড় হয়েছি হিন্দু-মুসলমানের ভেদাভেদ ভুলে, আমরা বেড়ে উঠেছি প্রাইমারি স্কুলের কোনো এক প্রদীপ স্যারের আদরে। আমাদের মগজ লালিত হয়েছে হাইস্কুলের কোনো এক পণ্ডিত স্যারের পাহাড়সম মনোবল আর সত্ আদর্শে, আমরা বাঁচতে শিখেছি নিভৃত গ্রামে কয়েক শ টাকার মাইনের সুবোধ স্যার, নারায়ণ স্যার, বাবু স্যার, গুণেন্দ্র স্যার, নিতু স্যারদের স্নেহতলে, যাঁরা আমাদের জীবন আলোকিত করে গেছেন। এই আলোকিত আমরা, আজকের এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই নমস্য মানুষদের বা তাঁদের উত্তরসূরিদের একটি বিশেষ গালি দেবার ধৃষ্টতা কিভাবে দেখাই?

পঁচাত্তরে পট পরিবর্তনের মাধ্যমে সুদীর্ঘদিন সামরিক আর পাকিস্তানপন্থী সাম্প্রদায়িক সরকার বাংলাদেশ শাসন করেছে। এদের সময়কালে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন হয়েছে ঠিক। কিন্তু আজকের নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ এবং সেখানকার প্রশাসনের নির্লিপ্ততা সবকিছু ঘটেছে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের ম্যান্ডেট নিয়ে আসা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। যে সরকারের সময়ে প্রতাপশালী যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে, সে সরকারের আমলে এমন ঘটনা আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের বিভ্রান্ত করে। আমরা হতাশ হই।

দেশ, সামাজ ও মানুষের চাইতে ধর্ম ও রাজনীতি যখন বড় হয়ে যায়, তখন ধর্মও যেমন টেকে না, সমাজও টেকে না। হিন্দু-মুসলমানের ভ্রাতৃত্বটুকু থাকে না। কিন্তু দেশের উন্নতির জন্য, কল্যাণের জন্য এই ভ্রাতৃত্বটুকু আমাদের খুব জরুরি দরকার। অন্য অঞ্চলের খবর জানি না, আমাদের ছেলেবেলায় সুনামগঞ্জের ভাটির গ্রামগুলোতে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে মধুর ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। পুজোয় যেমন আমরা দল বেঁধে দাওয়াতে যেতাম, ঈদেও আমাদের বন্ধুরা মুসলিমপাড়া চষে বেড়াত।

ফেইসবুকের কল্যাণে আমরা জানি যে নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর হামলা, গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের হত্যা পরবর্তী অনেক প্রতিবাদ হয়েছে দেশে-বিদেশে। আমাদের ব্রিসবেনেও গত ২০ নভেম্বর এক সভায় গিয়েছিলাম। আয়োজন করেছিল স্থানীয় পুজা উদযাপন পরিষদ। খুব ভয়ে ভয়ে চারদিকে ফ্যাকাসে বিমর্ষ মুখগুলোর দিকে তাকাচ্ছিলাম। দেশে রেখে আসা মা-বাবা-ভাইবোনের নিরাপত্তার জন্য এদের চোখে-মুখে যে ভয়ের ছাপ দেখেছি, তা এর আগে কখনো দেখিনি।

চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ভয়ঙ্কর অন্ধকার ঘিরে ধরে। কাঁদি। জগতজ্যোতি কাঁদে, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কাঁদে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের রূপকার ঘুমিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধু কাঁদে।


Link: This article was originally published here

Go to Top