Article
আমি জয়শ্রী গ্রামের ছেলে
বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকী লিখেছেন নিজের কথা
|
আমি জয়শ্রী গ্রামের ছেলে

নিজের কথা, নিজের জীবন ঘষে আগুন জ্বালানোর কথা বলার মতো লেখনীশক্তি আমার নেই, নিজের কথা নিজে বলার আরেকটা বড় অসুবিধাও আছে। জীবনের কিছু কিছু স্মৃতি আছে যেগুলো বাস্তবের চেয়েও বাস্তব হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কোনটা রেখে কোনটা বলি। এই অবস্থায় নিজের কথা নির্দিষ্ট শব্দসীমার মধ্যে লিখতে বসলে কী রকম বিপন্ন বোধ করতে হয়, সেটা পাঠকমাত্রই অনুমান করতে পারেন।

আমার জন্ম সুনাগঞ্জের হাওরপারের গ্রাম জয়শ্রীতে। ৩৭ বছর আগে। শাহ আবদুল করিমের বিখ্যাত গান ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম…’ তখনো সম্ভবত লেখেননি। হিন্দু-মুসলমান, জারি-সারি-মুর্শিদী আর বাউলগানে একাকার হয়েছিল আমাদের হাওরপারের মানুষের জীবন। এখানে মানুষের জীবনধারা আলাদা। ছয় মাস জল আর ছয় মাস বোরো ধান ফলানোর চক্রে বহতা-সংস্কৃতি। বৈশাখে ধান গোলায় তুলতে না তুলতেই চারদিক থইথই জল আর জল। শুরু হতো ছয় মাসের জলঘেরা-জীবন! জলঘেরা এই ছয় মাসে আমাদের (ছোটদের) প্রধান বিনোদন ছিল গোল্লাছুট, হাডুডু, ফুটবল, মার্বেল আর হাওর জলে অনিঃশেষ সাঁতার। হেমন্ত-দিনগুলো ছিল আরও উদ্দাম কোথায় যাচ্ছি, কী করছি। কেউ কোনো খোঁজখবর নিত না। এই উদ্দামতার মাঝেই একদিন জয়শ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু ছাত্রজীবন। নিয়ম করে পড়াশোনার কোনো বালাই ছিল না। প্রতি সন্ধ্যায় কুপিবাতির আলোতে গলা ফাটিয়ে কয়েকটি লাইন পড়ে বাড়ির বড়দের জানান দিতাম যে আমি পড়ছি।পরীক্ষা পাসের জন্য যেটুকু পড়তাম, তার বেশির ভাগই হতো আশ্বিন থেকে অগ্রহায়ণে বার্ষিক পরীক্ষা আসা পর্যন্ত।

জয়শ্রীতে তখন কোনো হাইস্কুল ছিল না। জয়শ্রী থেকে এক হাওর দূরে বাদশাগঞ্জে ছিল নিকটবর্তী উচ্চবিদ্যালয়। আমার হাইস্কুল জীবনের শুরুটা হয়েছিল অনেক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। প্রাইমারি পাস করার পর সাত মাস কেটে গিয়েছিল কোথাও ভর্তি করানো হয়নি। সে বছর আমাদের পরিবারে খুব বড় ধরনের কিছু সমস্যা হয়েছিল। আমার পড়াশোনার ব্যবস্থা করার চেয়ে পরিবারে সে সমস্যাগুলোর সমাধান করা অনেক বেশি জরুরি ছিল। আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে আমার আর পড়াশোনা হবে না। সেই অস্থির সময়ের মাঝে আম্মা এক চাচাতো ভাইকে দিয়ে বাদশাগঞ্জ হাইস্কুলে আমাকে ভর্তি করিয়েছিলেন। বছরের সাত মাস চলে গেছে, তারা তো আমাকে ভর্তি করবেই না, আমার সেই ভাই অনেক মিনতি করে সেদিন আমাকে ভর্তি করাতে পেরেছিলেন। জায়গিরের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন স্কুল থেকে তিন কিলোমিটার দূরের নিজগাবী গ্রামে।এক আত্মীয়ের বাড়িতে।

বাদশাগঞ্জ হাইস্কুলে আমি দুই বছর পড়েছিলাম। অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার পর জায়গির-সমস্যায় আমার এক বছর পড়াশোনা বন্ধ থাকল। আমার বড় ভাই আজহারুল আলম সিদ্দিকী সবুজ তখন মাত্র এইচএসসি পাস করেছেন। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। থাকতেন সিলেটের শহরতলীর খালমুখবাজার নামক এলাকায়। এবার সবুজ ভাই আমার পড়াশোনার দায়িত্ব নিলেন। ১৯৯০ সালের এপ্রিলের এক সকালে আমি সিলেটে গেলাম। ক্লাস এইটে ভর্তি হলাম। হলাম বলা ঠিক হবে না। সবুজ ভাই ভর্তি করালেন। লজিং থাকতাম। লজিং মানে বাড়ির দুই–একজন ছাত্র পড়ানোর বিনিময়ে থাকা-খাওয়া। মোগলাবাজার রেবতি রমন হাইস্কুল থেকে আমি ১৯৯৩ সালে এসএসসি পাস করলাম। পরে শুনেছিলাম আমার এসএসসির রেজাল্ট নাকি ওই স্কুলের তখন পর্যন্ত সেরা রেজাল্ট।

এইচএসসিতে ভর্তি হলাম সিলেট এমসি কলেজে। থাকতাম হোস্টেলের ১ নম্বর ব্লকের ১০৩ নম্বর রুমে। শত বছরের পুরোনো এই হোস্টেলের সব কটি ব্লক কয় বছর আগে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার ছয় বছরের জায়গির আর লজিং-জীবনের অবসান হলো। অফুরন্ত সময় পেলাম নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার। হোস্টেলের অন্য সহপাঠিরা যখন স্যারদের বাসায় পড়া, নোট ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত, আমার হাতে তখন অফুরন্ত সময়। নিজের মতো করে পড়ি। ফলে এইচএসসিতেও অনেক ভালো রেজাল্ট করলাম। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫ সালে সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়েও রসায়ন বিভাগে পড়ার সুযোগ পেলাম। তখন বিভাগের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক খলিলুর রহমান। জীবনে আমি অনেক গুণী মানুষের সংস্পর্শে এসেছি, অনেক মানুষ আমাকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছেন, কিন্তু এই একটিমাত্র মানুষ সেই নায়কদের মাঝে মহানায়ক হয়ে প্রতিদিন আমাকে তাঁর দেশপ্রেম, সততা, কর্মপদ্ধতি, মায়া-মমতা, দায়িত্ব, প্রজ্ঞা দিয়ে পথ দেখাচ্ছেন।
সেই সময়টায় শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটা সাংস্কৃতিক উত্থান হয়েছিল। জাফর ইকবাল স্যার তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাত্র এসেছেন। স্যারের তত্ত্বাবধানে অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠেছিল। বেশ কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। টিউশনি তো আছেই। শহরের অনেক কোচিং সেন্টারেরও ক্লাস নিতাম। এতসব কাজের সঙ্গে জড়িয়ে ডিপার্টমেন্টের রুটিনের সঙ্গে কোনোভাবেই খাপ খাওয়াতে পারতাম না। তাই ক্যাম্পাসে নিয়মিত ক্লাস করা হয়ে উঠত না। দুই সপ্তাহ পরীক্ষার প্রস্তুতিকালীন ছুটি এবং রুটিনের গ্যাপে পড়েও মোটামুটি ভালো রেজাল্ট করেই অনার্স এবং মাস্টার্স শেষ করলাম।

আমার জীবন সবচেয়ে বড় বাঁকটি নিয়েছিল ২০০৩ সালে। দক্ষিণ কোরিয়ার পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডির বৃত্তি পাওয়ার মাধ্যমে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে এমন একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। যেখানে আমাকে অন্যের জন্য খাটতে হবে না। যা করব পুরোটাই আমার নিজের জন্য।এই সুযোগটির পুরোটাই আমি কাজে লাগালাম। ২০০৭ সালে আমি পিএইচডি পাওয়ার আগ–পর্যন্ত পিএইচডির কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ অনেক পুরস্কারও পেলাম। এদের মধ্যে পুসান ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট অ্যাওয়ার্ড ছিল সবচেয়ে বড়। পিএইচডি’র কাজ থেকে প্রকাশিত পাবলিকেশনের ওপর ভিত্তি করে এ পুরস্কার দেওয়া হতো। ২০০৬ সালে ‘ব্রেইন কোরিয়া ২১’ নামের আরেকটি পুরস্কার পেয়েছিলাম। এ পুরস্কারটিও দেওয়া হতো বিভিন্ন বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত আর্টিকেলের কোয়ালিটির ওপর ভিত্তি করে।

পিএইচডির পরপরই অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক্টরেট করতে চলে আসি। সেখানে তিন বছর কাজ করেছি বিশ্বের নামকরা বিজ্ঞানী অধ্যাপক এলান বন্ডের অধীনে। ভৌত রসায়নের তাত্ত্বিক কিছু পদ্ধতি বিশ্লেষণ করা ছিল আমার গবেষণার বিষয়বস্তু। মনাশের সময়টা আমার গবেষণা জীবনে সবচেয়ে উর্বর ছিল। জানার, পড়ার, দেখার অফুরন্ত সুযোগ পেয়েছি। সে সময় আমি প্রথম টের পাই পদার্থ, রসায়ন ও বায়োলজির যথার্থ কম্বিনেশন ছাড়া বায়োন্যানোটেকলজি এবং মেডিসিনের পুরোপুরি সুবিধা মানুষের হাতের নাগালে আসবে না। মানব রোগ যেমন ক্যানসারের মতো অতি ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসা অল্প খরচে করতে হলে সহজলভ্য পদ্ধতি দরকার। সহজলভ্য এবং স্বল্পমূল্যের পার্সোনালাইজড ডায়াগনস্টিক ডিভাইস দরকার। যে ডিভাইস হবে মানবগর্ভ বা রক্তে সুগার নির্ণয়ের ডিভাইসের মতো। ডাক্তারের সহযোগিতা ছাড়াই একজন সাধারণ মানুষ ক্যানসার বা এই রকম রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে রক্ত বা শরীরের অন্যান্য ফ্লুয়িড টেস্টের মাধ্যমে জানতে পারবে। সে ক্ষেত্রে তাকে ব্যয়বহুল অনেক টেস্টের মধ্য দিয়ে যেতে হবে না।

কীভাবে ক্যানসারের মতো অতি ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসা অল্প খরচে করা সম্ভব, এই বিষয়ে কাজ করতে ২০১০ সালে আমি ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের নামকরা ইনস্টিটিউট, অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট ফর বায়োইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ন্যানোটেকনলজিতে যোগ দিই। এখানে বলে রাখা ভালো যে ক্যানসার এমন একটি ঘাতকব্যাধি, যেটি অজ্ঞাতসারে শরীরে বৃদ্ধি পায় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধরা পড়ে শেষ পর্যায়ে, যখন চিকিৎসার মাধ্যমে পুরোপুরি নিরাময় করা প্রায় অসম্ভব। এর পরিণতি কী হতে পারে তার হাজারো উদাহারণ আমাদের জানা। ক্যানসারে আমাদের কেউ মা, কেউ বাবা, কেউবা স্ত্রী, ভাই, বোন, সন্তান হারিয়েছি। এই তো কয় দিন আগে আমরা হারিয়েছি বাঙালির একজন শ্রেষ্ঠ সন্তান, হুমায়ূন আহমেদকে। কিন্তু এই রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব হলে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্যানসার রোগীকে পুরোপুরি স্বভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যানসার শনাক্তকরণের একটি সহজলভ্য পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য ২০১২ সালে আমি অস্ট্রেলিয়া ফেডারেল সরকারের ৩ লাখ ৭৫ হাজার ডলার অনুদান পাই। সেই অর্থায়নে আমি এবং আমার ছাত্ররা একটি ডিভাইস উদ্ভাবন করি, যার মাধ্যমে ক্যানসার রোগীর রক্তের অভ্যন্তরে অবস্থিত অতি বিরল এক ধরনের কোষ (সার্কুলেটিং টিউমার শেল) সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা যায়। এই কোষগুলো ক্যানসারের যেকোনো পর্যায়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য বহন করে। এই ডিভাইসের কার্যকারিতার মূলে আছে ‘ন্যানোশেয়ারিং’ নামক এক পদ্ধতি। এই পদ্ধতিকে কীভাবে অন্যান্য রোগ নির্ণয়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তার জন্য ২০১৪ সালে আমাদের টিম আবার অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকার থেকে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ডলার অনুদান পায়। আমাদের উদ্ভাবিত ‘ন্যানোশেয়ারিং’ভিত্তিক এই ডিভাইসকে ক্লিনিক্যালি ব্যবহার উপযোগী করার জন্য ২০১৫ সালে আমি অস্ট্রেলিয়ান হেলথ অ্যান্ড মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল থেকে ৪ লাখ ১২ হাজার ডলার অনুদান পাই। আমরা এখন এই যন্ত্রটি দিয়ে কীভাবে রোগীদের শরীরে বিভিন্ন পর্যায়ের ক্যানসার শনাক্ত করা যায় এবং থেরাপি বা ড্রাগ প্রয়োগের কার্যকরিতা সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় তার ওপর কাজ করছি।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী প্রতিবছর ফেডারেল সরকারের অনুদানপ্রাপ্ত ও নির্বাচিত তরুণ বিজ্ঞানীদের তাঁদের গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ অস্ট্রেলিয়ার সংসদ ভবনে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। ২০১১ এবং ২০১২ সালে আমি সেই নৈশভোজে আমন্ত্রিত ছিলাম।

এ বছর সেপ্টেম্বরে আমি অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটিতে স্থায়ী ফেকাল্টি মেম্বার হিসেবে যুক্ত হয়েছি। যখন মনাশে পোস্টডক করতাম তখনই জানতাম যে অস্ট্রেলিয়ার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়াব। কিন্তু সেটা যে একটা লিডারশিপ পজিশন নিয়ে এত তাড়াতাড়ি আসবে, তা ভাবিনি। এই পজিশন আমার সামনে অনেক পথ খুলে দিয়েছে। আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন উন্নতমানের একটা ল্যাব। যে ল্যাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছাত্রদের সঙ্গে বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীরা কাজ করবে, মেইনস্ট্রিম গবেষণায় অবদান রাখবে। সে স্বপ্ন এখন বাস্তবের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে।

বাংলাদেশের প্রতি টান অনুভব করি প্রতি মুহূর্তে। এই দেশকে কি ভোলা যায়? যে দেশে আমার একটা নিজস্ব আকাশ ছিল? যে দেশের বাতাস-মাটি-পানি আমার রক্তে বহমান? যে দেশের পাখি আমার ঘুম ভাঙাত সোনার শৈশবে? যেখানে শ্বাস নিতাম বাঙলায়, হাসি, কান্না, আনন্দ, দুঃখ সবই ছিল বাংলায়? এই দেশের কাছে আমি আমৃত্যু ঋণী। যে দেশ আমাকে তৈরি হওয়ার পথ দেখিয়েছে সে দেশের তরুণ-তরুণীদের গবেষণার সুযোগ করে দিয়ে সে ঋণের দায় কিছুটা হলেও কমাতে চাই।


Link: This article was originally published here