Article
খুঁজে ফিরি শৈশবে দেখা পূজা আর পূজারিদের
অস্ট্রেলিয়ায় বসে পূজার অনুষ্ঠান দেখার সময় শৈশবের দেখা সম্প্রীতির দূর্গাপূজার স্মৃতিচারণ
|
খুঁজে ফিরি শৈশবে দেখা পূজা আর পূজারিদের

আমার বন্ধু মনোজ। জয়শ্রীর ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে। ২০০৭ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে এই পৃথিবী থেকে তাঁকে চলে যেতে হয়। জয়শ্রী চৌধুরী বাড়ির ঠিক পাশেই তাঁদের বাড়ি। ছেলেবেলায় এই চৌধুরী বাড়িটি আমার কাছে সাক্ষাৎ ভুতুড়ে বাড়ি ছিল। খুবই দৈন্যদশা। ভাঙা দালান, দালানের গা ঘেঁষে নানা ধরনের গাছ জন্মেছিল। শুনেছি একসময় জয়শ্রী চৌধুরী বাড়ির বিরাট নামডাক ছিল। ওই তল্লাটে চৌধুরীরা নাকি হাতির পিঠে চড়ে জমি দেখতে যেতেন। চৌধুরী বাড়ির সামনেই ছিল বিরাট ধারাম হাওর। হাওরের দিকে তাকিয়ে আঙুল উঁচিয়ে চৌধুরীরা বাড়িতে আগত অতিথিদের বলতেন, আপনার দুই চোখে যত দূর স্পষ্ট দেখা যায় সবই আমাদের জায়গা জমি। তবে আমাদের ছেলেবেলায় চৌধুরীদের জৌলুশের ছিটেফোঁটাও আর ছিল না। তাদের অধিকাংশই জয়শ্রী ছেড়ে, দেশ ছেড়েও চলে গিয়েছিলেন বলে শুনেছি। এরপরেও জয়শ্রীর সর্বজনীন পূজাটি চৌধুরী বাড়ির সামনেই হতো। পূজার পুরো সময়টা হিন্দু-মুসলমান একাকার হয়ে যেত। মুসলমানদের জন্য আলাদা খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা থাকত।

নৃত্য পরিবেশন করছেন ইমন চৌধুরী ও সুদেষ্ণা পালনৃত্য পরিবেশন করছেন ইমন চৌধুরী ও সুদেষ্ণা পাল

প্রতিমার জন্য বিশাল স্টেজ করা হতো। দেবীদুর্গা ও তাঁর সাথিদের খুব সুন্দর করে সাজানো হতো। ভাটি অঞ্চলে তখন ইলেকট্রিসিটি ছিল না। মণ্ডপ ও মণ্ডপের চারপাশ আলোকিত করতে অনেকগুলো হ্যাজাক লাইট জ্বালানো হতো। এই লাইটের উজ্জ্বল সাদা আলোতে প্রত্যেক দেব-দেবীকে খুব জীবন্ত মনে হতো। দেবীদুর্গা দশ হাত মেলে সিংহের ওপরে আসীন হয়ে যেন সব নিয়ন্ত্রণ করতেন। পৌরাণিক যুদ্ধদেবতা কার্তিককে মনে হতো যেন বীরদর্পে বসে আছেন, বিদ্যার দেবী সরস্বতীকে মনে হতো শ্বেতপদ্মে বসা পদ্মলোচনা ও বীণা পুস্তকধারিণী এক দিব্য নারীমূর্তি। আর ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মীর হাসি যেন ঝলমল করে আছড়ে পড়ত পুরো এলাকা জুড়ে।

গান গাইছেন শুক্তিকা বোসগান গাইছেন শুক্তিকা বোস

গত ৩০ বছর ধরে দুর্গাপূজার নাম শুনলেই ছোটবেলায় জয়শ্রীতে দেখে আসা এমন পূজা মণ্ডপের ছবিই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনোজ বলেছিল—দেবীদুর্গা একজন বহুরূপী নারী। তিনি শক্তির দেবী, অসীম ক্ষমতাধর। তিনি দুর্গতি নাশ করেন বলে তাঁকে দুর্গা বলা হয়। আবার তিনি দুর্গম নামক অসুরকে নাশ করেছিলেন বলে তাঁর নাম দুর্গা। দুর্গার শাব্দিক অর্থ হচ্ছে ব্যূহ বা আবদ্ধ স্থান। বলা হয়ে থাকে, মানুষকে আবদ্ধ করে রাখা দুঃখ আর শোককে তিনি দূর করেন। আবার অনেক শাস্ত্রকারেরা মনে করেন দুঃখের দ্বারা যাকে লাভ করা যায় তিনিই দুর্গা। শরৎ আশ্বিনের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে শারদীয়া দুর্গাপূজার বোধন ও অধিবাস হয় সেটার শেষ হয় সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমী তিথিতে বিসর্জন দিয়ে। দেবীদুর্গার বাহন সিংহ। তবে তিনি আসতে পারেন তাঁর ইচ্ছেমতো যেকোনো বাহনে চড়ে। সেটি হতে পারে নৌকা কিংবা রথ। অথবা আধুনিক কোনো বাহন।

দুর্গাপূজায় ষষ্ঠীর দিন থেকে বিসর্জনের আগ পর্যন্ত জয়শ্রী একটা উৎসবের গ্রাম হয়ে যেত। আমার কাছে পূজার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল মণ্ডপে গানের পর্বগুলো। করুণাদা ছিল আমাদের এলাকার সবচেয়ে বড় গায়ক। ভাটির জয়শ্রীতে তাঁর মতো বড় গায়ক সেই সময় এবং পরবর্তীতে অনেক বছর কেউ ছিলেন না। শ্রাবণ মেঘের দিনের সেই বিখ্যাত মতি গায়কের মতো। চারদিকে এক নামে সবাই তাঁকে চিনত। করুণাদা একাই মাতিয়ে রাখতেন পূজামণ্ডপ। আমার মতো ছোট বালকের কাছে তিনিই ছিলেন তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গায়ক। সে সময় তাঁর গানগুলোর মর্মার্থ কিছু না বুঝলেও, পরবর্তীতে তাঁর গাওয়া বহুল প্রচলিত ভক্তিমূলক গানগুলো আমাকে বারবার শিহরিত করেছে। জয়শ্রীতে পূজার সময়ে দেখা ধূপ-ধুনার পাত্র নিয়ে নানান ভঙ্গিমার নাচ এখনো ভুলতে পারিনি। এখনো চোখে ভাসে কৃষ্ণ তিল, তুলসী করজোড়ে মন্ত্র পড়তে পড়তে কত চেনা না চেনা মানুষ দেবীকে ভক্তিভরে প্রণাম করছে। অনেক প্রবীণকে দেখেছি যতবার দেবীর সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করছেন ততবার হাত কপালে তুলে প্রণামের ভঙ্গি করছেন। একবার দুইবার করে করে অনেককে পনেরো বিশবারও প্রণাম করতে দেখেছি।

দুর্গোৎসবের আনন্দে মেতেছে খুদে তিন শিল্পীদুর্গোৎসবের আনন্দে মেতেছে খুদে তিন শিল্পী

জয়শ্রীর এই পূজায় দূর দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজনরাও আসতেন। অনেক নাইওরীও আসতেন। সন্ধ্যার পরে হিন্দু পাড়ার সকল তরুণী মেয়েদের পূজামণ্ডপে ঢল নামত। এই গ্রামে জন্মেছি, কিন্তু এদের অনেককেই আমি চিনতাম না। এদের বেশির ভাগের বয়স ছিল ১৮ বা ১৯। আমার বোনের বয়সী। আমার বোনের দু-একজন বান্ধবীও সেখানে থাকতেন। তারা আসতেন দল বেঁধে। দেবীর সামনে তাদের প্রণাম করার দৃশ্যটি হ্যাজাক বাতির আলোকিত আলোতে এতটাই মোহনীয় আর স্বর্গীয় ছিল যে, পূজা বলতে এখনো আমি আমার বালক বয়সে দেখা এমন মোহনীয়, এমন নিবেদিত প্রণামকেই বুঝি।

বিসর্জনের দিন একটা করুণ পরিবেশের সৃষ্টি হতো। শঙ্খের সুর আর উলুর হাহাকারে চারদিক কেমন যেন ভারী হয়ে উঠত। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন একদিন মনোজ জানিয়েছিল, এটাকে সে বিসর্জন মনে করে না, সে বিশ্বাস করে মা দুর্গা মর্ত্যলোকে বাপের বাড়ি থেকে কৈলাসে তাঁর শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছেন। আটপৌরে বাঙালি নারী যখন বাপের বাড়িতে কয়েক দিনের জন্য এসে আবার চলে যাওয়ার সময় আবেগে ডুকরে কেঁদে ওঠে, তেমনি দেবী আজ কাঁদবে। আর দেবী কাঁদবেন বলে হিন্দু সম্প্রদায়ের সকল নারী আর তাঁর ভক্তরা কেঁদে উঠবেন। ভক্তদের চোখের জল, কান্না, সিঁদুরের লাল রং সব রেখে তিনি চলে যাবেন ১১ মাস ২৬ দিনের জন্য। বিদায়ের এই ক্ষণে অন্য এক মাত্রা দিত বৃষ্টি। টিপ টিপ করে বৃষ্টি হতো। সারাদিন দুর্গা দেবীকে বিসর্জন দেবে বলে মনের দুঃখে আকাশও যেন ক্রন্দসী। ঝিরিঝিরি এই বৃষ্টির সঙ্গে পূজা যেন একই সুতোয় বাঁধা। ২০০৩ সালে সিলেট ছেড়ে প্রবাসে আসার আগ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি দশমীতেই টিপ টিপ করে বৃষ্টি হতে দেখেছি। আবার, শুভ মহালয়া থেকে বিসর্জন পর্যন্ত—কখনো একদিন, কখনো দুদিন কখনোবা পুরো সময়টিই টিপ টিপ বৃষ্টি হতো। সেই বৃষ্টির মধ্যে দেবীকে নৌকার গলুইয়ে বসিয়ে, ঢাকঢোল করতাল বাজিয়ে বিসর্জনের জন্য নিয়ে যাওয়া হতো। দেবীদুর্গার প্রস্থানের দিন প্রকৃতির এমন বিমর্ষ রূপের কথা মনে হলেই চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে।

আরতি নিবেদন করছেন দেবদাস গুহ ও ঊর্মিলা রায়আরতি নিবেদন করছেন দেবদাস গুহ ও ঊর্মিলা রায়

আজ প্রায় ১৪ বছর ধরে প্রবাসী। দুর্গা পূজার সেই রং ও রূপ এখন আর মনে করতে পারি না। অনেক কিছুর ভিড়ে আস্তে আস্তে ফিকে হতে হতে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে স্মৃতিগুলো। এর পরেও সুযোগ পেলেই পূজা দেখতে যাই। খুঁজে ফিরি শৈশবে ফেলে আসা সময়গুলো।

দুই.

গত ১৯ বছর যাবৎ ব্রিসবেনে নিয়মিত সর্বজনীন দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। এবারে দুর্গাপূজা হয়েছে তিন দিনব্যাপী। ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত লোগান ওয়েস্ট কমিউনিটি হলে। এই আয়োজনের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ পূজা ও কালচারাল সোসাইটি, সংক্ষেপে ‘বিপিসিএস’ নামে একটি সংগঠন। সংগঠনটির নাম থেকেই এটা স্পষ্ট, হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় এই ধর্মীয় উৎসবটি পালন করা এই সংগঠনের অন্যতম প্রধান একটি কাজ। ব্রিসবেন ও এর আশপাশের শহরগুলোতে বসবাসকারী হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রায় সকলেই এই পূজাতে অংশগ্রহণ করেন। ব্রিসবেনে আমার দীর্ঘ আট বছরের মধ্যে, এর আগে মাত্র একবার, ২০১৪ সালে পূজা দেখতে এসেছিলাম। সেবার আমাকে অনুপদা নিমন্ত্রণ করেছিলেন। বিপিসিএসের পাশাপাশি এর সকল সম্মানিত সদস্যরা এই পূজার ব্যয়ভার বহন করেন। পূজার মাহাত্ম্য ও সর্বজনীনতা বজায় রাখতে বিপিসিএসের সদস্যরা অন্য ধর্ম, জাত, বর্ণের বন্ধুবান্ধব এবং তাদের পরিবার পরিজনকেও নিমন্ত্রণ করতে পারেন। এই বছর আবারও অনুপদার নিমন্ত্রণে আমার পূজাতে যাওয়ার সুযোগ হয়। অবশ্য এবারই প্রথম বিপিসিএসের বর্তমান সভাপতি পরিতম দত্তও আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। পূজায় নিমন্ত্রণের বিষয়টি এত গুরুত্ব দিয়ে বলছি এই জন্য যে, হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছাড়া অন্য ধর্ম থেকে শুধু নিমন্ত্রিত অতিথিরাই এখানে অংশ নিতে পারেন। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, দুর্গাপূজার সর্বজনীনতাকে আরও বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দিতে হলে পূজার এই চারটি দিন সকল বর্ণ ও ধর্মের মানুষদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত। কিন্তু আয়োজকদের হয়তো অনেক বিষয় চিন্তা করে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আমি পূজায় গিয়েছিলাম দশমীর দিন। দুপুর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ছিলাম। আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকায় পূজার পুরো সময়টি জুড়ে সবকিছু ছিল খুব নিয়মমাফিক, অর্গানাইজড যেটা বাঙালিদের এ রকম বড় অনুষ্ঠানে প্রায় দেখাই যায় না। কমপক্ষে তিনজন এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, আমার কোনো কিছু লাগবে কিনা। বসার জায়গা পেতে সমস্যা হয়েছে কিনা। অধ্যাপক তপন কুমার সাহা, অধ্যাপক সঞ্জয় পালের মতো সিনিয়রদেরও দেখেছি সাধারণ স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকায় কাজ করতে। বিরাট একটি অনুষ্ঠানকে এত পরিপাটি করে, এত শৃঙ্খলার মধ্যে রাখতে গেলে আয়োজকদের তাদের পরিকল্পনায় কিছুটা হিসাবি এবং নির্দয় হতে হবে। সুতরাং নিমন্ত্রণের মাধ্যমে উপস্থিতি সীমিত রাখার ব্যাপারটি তখন আর খারাপ লাগছিল না। মূল অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার ঘণ্টাখানিক আগে এসে ধারণাটা আরও পোক্ত হলো। সন্ধ্যার দিকে মূল হলের দরজার সামনে হিন্দু কমিউনিটি ও বিপিসিএসের কর্তাব্যক্তিরা দল বেঁধে পূজারি ও আমন্ত্রিত অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছেন। ব্যাপারটা খুব সামান্য মনে হলেও আমার ১৪ বছরের বিদেশজীবনে খুব কম এমনটি দেখেছি। এ রকম দেখেছি ছেলেবেলার। ছোটবেলায় আমাদের জয়শ্রীতে হিন্দু-মুসলমান সবার প্রায় সব সামাজিক অনুষ্ঠানেই এইভাবেই স্বাগতম জানাতে দেখতাম।

পুরোহিত পল্লব ভট্টাচার্যের সঙ্গে পূজারিরাপুরোহিত পল্লব ভট্টাচার্যের সঙ্গে পূজারিরা

কমিউনিটি হলের প্রবেশমুখে কর্কশিটের তৈরি ছোট একটি গেট দেখলাম। ভেতরে ঢুকে দেখলাম অপূর্ব সুন্দর করে মণ্ডপ সাজানো হয়েছে। মণ্ডপের চারপাশেও কর্কশিটের কিছু সুন্দর কারুকাজ এবং আলপনা করা হয়েছে। এই কারুকাজ ও আলপনাগুলো খুব অচেনা নয়। আমি বোধ হয় একটু বেশিই আবেগী আর স্মৃতিকাতর। মনে পড়ল, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ‘শিকড়’ নামক একটি সংগঠনের হয়ে ব্যাক স্টেজে কর্কশিট দিয়ে আমরা এগুলো করতাম। উত্তেজনা আর ভালোবাসা, তুমুল আড্ডা দিয়ে রাত জেগে জেগে মঞ্চ সাজিয়ে তুলতাম। শুনেছি কর্কশিটের এই কাজগুলো করেছে আমাদের জয়—জ্যোতিষ দাস জয়।

দুর্গাপূজার অনুষ্ঠান হবে আর পূজার ম্যাগাজিন বের করা হবে না, তাতো হয় না? পূজা উপলক্ষে ‘শারদ অর্ঘ্য’ নামে একটি ম্যাগাজিন বিপিসিএস নিয়মিত বের করে। এবার বেরিয়েছে এর ১৯তম সংখ্যা। পরিতম দত্ত আমাকে এর একটি কপি পড়তে দিলেন। পূজার সন্ধ্যা পর্ব শুরু হওয়ার আগেই শারদ অর্ঘ্য পুরোটা পড়ে ফেললাম। লেখার মান যে খুব আহামরি ছিল তা নয়, তবে জগদীশ চন্দ্র বিশ্বাসের একটি লেখা হৃদয়ে দাগ কেটেছে। বাচ্চাদের কয়েকটি পেইন্টিংও চোখে লেগে আছে। তবে অনেক বিরক্ত হয়েছি পূজার এই অতি আবশ্যক ম্যাগাজিনটিকে এত এত বিজ্ঞাপন দিয়ে ভরিয়ে দেওয়ার জন্য। মনে হয়েছে ম্যাগাজিনটি করাই হয়েছে বিজ্ঞাপনগুলো ছাপানোর জন্য। হয়তো এর পেছনের কারণটিও আমরা সবাই জানি। এত বড় একটি পূজাকে তিন দিনব্যাপী চালাতে খরচের একটি ব্যাপার থাকে সে ক্ষেত্রে বিপিসিএসকে অবশ্যই বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করতে হবে। তবে তাদেরই ঠিক করতে হবে এটি কীভাবে আরও ভালো মতো করা যায়। আমার ব্যক্তিগত অভিমত, যেহেতু ব্রিসবেন থেকে এখনো নিয়মিত কোনো অলাভজনক সাহিত্য এবং সংস্কৃতির কাগজ বের হয় না, তাই এই ম্যাগাজিনটি এই শূন্যস্থানটি সহজেই পূরণ করতে পারে। সেখানে থাকতে পারে উঁচুমানের নিখাদ সাহিত্য, থাকতে পারে হিন্দু ধর্মসংশ্লিষ্ট লেখা। উঁচুমানের লেখার অভাব হওয়ার কথা নয়। দেশের স্বনামধন্য যেকোনো লেখকদের সঙ্গে বিপিসিএস যোগযোগ করলে অবশ্যই তাঁরা লেখা দেবেন। আর তা ছাড়া, আমার জানামতে, এখানে যে প্রজন্ম বেড়ে উঠছে তাদের অনেকেই ভালো লেখে। এদের অনেকের নিজস্ব ব্লগ আছে। এরা স্কুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের সাহিত্যের জন্য প্রশংসিত এবং পুরস্কৃত। এদের এখানে লিখতে আকৃষ্ট করতে হবে। আর এটি করতে হবে কোয়ালিটি দিয়ে। এটুকু বলতে পারি, ম্যাগাজিনটি যখন কোয়ালিটি বজায় রেখে চলবে বা চালানো হবে, তখন একদিকে যেমন বিজ্ঞাপনের পাতা পাতলা হতে হতে একটি দুটি বা কয়েকটিতে এসে থামবে, অন্যদিকে বিজ্ঞাপনের হারও কিন্তু আনুপাতিক হারে বাড়ানো যাবে। এতে করে কাগজটি যেমন সুন্দর দেখাবে, বিজ্ঞাপন দাতাও টাকা দিয়ে তৃপ্তি পাবে। বরং প্রতি বছরে এই কাগজে এক পাতা বিজ্ঞাপন পাওয়ার জন্য বিজ্ঞাপনদাতাদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে।

সাধারণত এই রকম অনুষ্ঠানে এখানকার মূলধারার রাজনৈতিক অনেক নেতা অংশ নেন। সেদিনের পূজার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন ব্রিসবেন সরকারের দুই দুইটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী লিয়ান ইনক ও এমপি লিনাস পাওয়ার। সন্ধ্যা ৬টার একটু পরেই লিয়ান ইনক পূজামণ্ডপে আসেন। এখানকার রাজনীতিবিদরাতো আমাদের দেশের নেতাদের মতো নন। এঁরা সাধারণ মানুষের নেতা। তাই এঁরা সাধারণ মানুষের মতোই চলেন, বলেন। তাঁদের সঙ্গে বিশাল কোনো বহরও থাকে না। বড়জোর একজন ফটোগ্রাফার কাম সেক্রেটারি। সেটাও সব সময় থাকে না। অনেক সময় তারা একাই গাড়ি ড্রাইভ করে চলে আসেন। দেখলাম মন্ত্রী ও এমপি দুজনেই উপস্থিত অনেকের সঙ্গে কথা বলছেন। কুশল বিনিময় করছেন। পরিতম দত্ত ও তপন সরকার তাঁদের অনেকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। আমার মতো সামান্য মানুষকেও তাঁদের চোখ এড়িয়ে যায় না। চেয়ারে চুপচাপ বসে ছিলাম। তপন সরকার পরিচয় করিয়ে দিলেন। অপ্রস্তুত হয়ে শুধু হা-হু করলাম কিছুক্ষণ। আসলে সেই সময়টায় আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল, বাংলাদেশের মন্ত্রীদের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের মুহূর্তগুলোর কথা। কী ভয়ানক ভাবভঙ্গি! আমাদের সঙ্গে তার দেখা করার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ। অথচ এই আমরাই ভোটের সময় নেচে নেচে এদের ভোট দিয়ে পাস করাই।

পূজা শেষে প্রদীপ আরতিপূজা শেষে প্রদীপ আরতি

ঠিক ৬টা ৩০ মিনিটে মূল স্টেজের পর্দা উঠে গেল। রীতি অনুসারে সর্বপ্রথমেই অস্ট্রেলিয়া ভূখণ্ডের আদিবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানানো হলো। এই পর্বের শুরুতেই অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন এখানে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্মের কয়েকজন—শুক্তিকা, সত্যকি, উপমা, পৃথ্বী ও নিহাল। এরপর পরেই অপরাজিতা সরকার, শাওন বৈদ্য, মিতা পোদ্দার, সীমা পাড়, জ্যোতিষ দাস, অপর্ণা নাগ, রুমা পাল, সুভাষ সাহা ও সঞ্জিত মণ্ডল সম্মিলিতভাবে পরিবেশন করেন আমাদের প্রাণের সংগীত-আমাদের জাতীয় সংগীত। পুরো হল জুড়ে সবাই যেন গেয়ে উঠেছিল ‘আমার সোনার বাঙলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। জাতীয় সংগীতের পরেই তারা ‘জাগো মা’ গানটি কোরাস করেন। এর আগে এই গানটি অনেকবার শুনেছি, কিন্তু সেদিন একটু অন্যরকম ভালো লেগেছিল। এর কারণ যতটা না পরিবেশনার মুনশিয়ানা তার চাইতে বেশি সামগ্রিক পরিবেশ। উল্লাসে উদ্ভাসিত মাতৃবন্দনায় মেতে ওঠা একঝাঁক উপস্থিতি, মঞ্চের আলোকসজ্জা ও পেছনে দেবীদুর্গা তাঁর সাথিদের প্রতিমার উপস্থিতি, সবকিছুই একটা অন্যরকম মাত্রা যোগ করেছিল।

অনুষ্ঠানের এই পর্বটির জন্য সেই দুপুর থেকেই অপেক্ষা করছিলাম। আগেই জানতাম ইমন চৌধুরীর একটি নৃত্য নাটক আছে। ইমনকে প্রথম নাচতে দেখেছিলাম ব্রিসবেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানে। এবার ইমন ও সুদেষ্ণা পালের কোরিওগ্রাফিতে পরিবেশিত হয় নৃত্যনাটক ‘নব দুর্গা’। আয়ে গিরি নন্দিনী, নন্দিতা মেদিনীর তাল ও সুরের সঙ্গে প্রথমে পাঁচজন ছোট ছোট বাচ্চা মেয়ে কী সুন্দর করে নাচল! এদের নামের মধ্যেও আবার অপূর্ব মিল আছে—তিনজনের নামই আদ্রিতা। আদ্রিতা সাহা, সরকার ও বৈদ্য। এই দলের অপর দুজন ছিল আনহিতা ও রিদিমা। এদের নাচের বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই আমার জন্য অপেক্ষা করছিল বড় বিস্ময়। দশজন সিনিয়র এই গানের তালে তালে হলভর্তি সকলকে মোহিত করে রাখলেন প্রায় দশ মিনিট। ইমনের সঙ্গে ছিলেন সুদেষ্ণা পাল, দীপিকা রায়, সুচরিতা কর্মকার, সুস্মিতা চক্রবর্তী, প্রমিতা সোম, বেনিতা সাহা, অমৃতা নাগ, অরিন পোদ্দার ও অর্পিতা বণিক। চমৎকার একটি রুটিনে তাঁরা নেচেছেন। আমি নৃত্য বিশারদ নই। নৃত্যের ভালো মন্দ কিছুই বুঝি না। তবে এটুকু বুঝেছিলাম তারা নৃত্যে দেবীদুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধরত রূপটি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। নারীদের সকলে ছিলেন যুদ্ধের সাজে সজ্জিতা। ভয়ংকর শক্তি আর সংকল্পের দৃঢ়তা ও দৃপ্ততা নিয়ে ধার্মিককে রক্ষা আর অধার্মিককে বিনাশ করতে নেমেছিলেন তারা। অনেকটা মনে হয়েছিল, অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে নৃত্যের তালে তালে সুন্দরের জয়গান গাওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানের এই পর্যায়ে পরিতম দত্ত লিয়ান ইনক ও কাউন্সিলর লরি স্মিথকে নিয়ে স্টেজে ওঠেন। সভাপতির সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে পরিতম দা খুব সুন্দর করে কয়েকটি বাক্যে দুর্গাপূজার মাহাত্ম্য ও ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেবীদুর্গা অন্যায় ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ন্যায় ও শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক। দেবীদুর্গা মনের দৈন্যতা দূর করে কল্যাণ নিশ্চিত করেন। তিনি দুর্গাপূজাকে বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব বলে উল্লেখ করেন। তিনি মনে করেন, দুর্গাপূজার এই উৎসব, এই মিলনমেলা ব্রিসবেনে বসবাসরত সকল বাঙালি হিন্দুদের এখানকার অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে একটি সেতুবন্ধ তৈরিতে সহযোগিতা করবে। পূজার এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি সকলকে ধন্যবাদ জানান। বিপিসিএসের পক্ষ থেকে সকল বিজ্ঞাপনদাতা ও স্বেচ্ছাসেবকদের অশেষ কৃতজ্ঞতা জানান। তার বক্তব্যের পর পরেই লিয়ান ইনক তাঁর মনোমুগ্ধকর বক্তব্যে দর্শকদের মাতিয়ে রাখেন প্রায় মিনিট সাতেক। তাঁর সরকারের অসাম্প্রদায়িক ও বহু সংস্কৃতির নীতি এবং তাঁর ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতা সকলের সামনে তুলে ধরেন। দুর্গাপূজার এই অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য বিপিসিএসকে ধন্যবাদ জানান। কাউন্সিলর লরি স্মিথ তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে এই চমৎকার অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য বিপিসিএসকে ধন্যবাদ দেওয়ার পাশাপাশি কমিউনিটির যেকোনো কাজে, বিশেষ করে বহু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

অতিথিরা মঞ্চ থেকে নামার পর পরেই মঞ্চে উঠলেন সুচরিতা কর্মকার ও তার মেয়ে ঋশিতা কর্মকার। সুচরিতা কর্মকারের গান আমি ব্রিসবেনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অনেকবার শুনলেও এই অনুষ্ঠানের আগে তাঁর নাচ কখনো দেখিনি। ইমন ও সুদেষ্ণাদের সঙ্গে নৃত্যনাট্যে অসম্ভব সুন্দর নাচের পর তিনি তাঁর মেয়েকে নিয়ে ‘মেঘের পালক চাঁদের নোলক’ গানের সঙ্গে অপরূপ নেচে আবার ও দর্শকদের সকলকে কয়েক মিনিট অসম্ভব ভালো একটি ডুয়েট উপহার দিলেন। অপলক চোখে মা-মেয়ের নৃত্য দেখলাম। এই পর্বে বেশ কয়েকটি একক ও ডুয়েট গান এবং নৃত্য পরিবেশিত হয়েছিল। নকশি চৌধুরীর কথক নৃত্যটি ছিল মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো। ‘shape of you’ গানের সুরের তালে তালে দীপিকা রায় ও পায়েল বোসের আরেকটি ডুয়েট থেকে চোখ ফেরাতেই পারছিলাম না।

সুচরিতা কর্মকার ও তাঁর মেয়ে ঋশিতা কর্মকারের দ্বৈত পরিবেশনাসুচরিতা কর্মকার ও তাঁর মেয়ে ঋশিতা কর্মকারের দ্বৈত পরিবেশনা

এর পরে গিটার হাতে স্টেজে উঠল এই প্রজন্মের মেয়ে-শুক্তিকা বোস। সে পরপর শোনাল জন মেয়ারের Waiting on the world to change এবং পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের Heal the world. জন মেয়ারের গানটি থেকে একটি লাইন এখনো কানে বাজছে—‘one day our generation is gonna rule the population, so we keep on waiting, waiting on the world to change’। আর দ্বিতীয় গানটিতো বিশ্ববিখ্যাত। এর প্রতিটি লাইনইতো অনেকের মগজে, মনে দাগ কেটে আছে। তবে একটি লাইনের কথা কেন জানি বারবার বলতে ইচ্ছে হয় ‘there are people dying, if you care enough for the living make it (the world) a better place for you and for me…’। অনুষ্ঠানের এই পর্যায়ে মিনিট বিশেকের জন্য আমি বাইরে গিয়েছিলাম। আবার হলে ঢুকতেই দেখি মঞ্চে ইমন ও সুদেষ্ণার একটি ক্ল্যাসিক্যাল ডুয়েট নৃত্য চলছে। ‘মধুরা মুরাতি মনহারা আর্তি’-কী অপূর্ব নৃত্য। বিদেশে এত বছরের মধ্যে এর আগে এমনটি দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না।

এত গান এত নাচ হয়ে গেল, কিন্তু একটিও কবিতা তখনো পড়া হয়নি। মনে মনে অপেক্ষা করছিলাম। আর ঠিক তখনই উপমা সাহা মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘আমার দুর্গা’ কবিতাটি আবৃত্তি করলেন। যদিও আশানুরূপ হয়নি, এর পরেও পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে এটিই ছিল একমাত্র কবিতা। বিপিসিএসের কর্তা ব্যক্তিদের এর পরেরবার আমার মতো কিছু কবিতাপ্রেমীর দিকে নজর দিয়ে দু-চারটি কবিতা আবৃত্তি যুক্ত করার আহ্বান করব। এই কবিতাটির পর পরেই রাখি মণ্ডল গাইলেন কালজয়ী গান, ‘এই সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায় একি বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু।’ এরপর সুচরিতা কর্মকার আবার স্টেজে উঠলেন তাঁর একক গান নিয়ে। এবার তিনি গাইলেন—‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি/ দেখো ওই ঝিলি মিলি চাঁদ সারা রাত আকাশে…।

এখন বাংলাদেশে এমন হয় কিনা জানি না, কিন্তু এখানকার অনুষ্ঠানে, বিশেষ করে পূজা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাচ্চাদের অনেক ইভেন্ট থাকে। ছোট ছোট বাচ্চারা নাচ গানে যে পারদর্শিতা দেখায় তা দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। ব্রিসবেনের পূজার এই অনুষ্ঠানেও বাচ্চাদের জন্য অনেকগুলো নাচ ও গানের পর্ব ছিল। আয়োজকদের এই ব্যাপারটি আমার খুব ভালো লেগেছে। এখানকার প্রজন্মকে আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। বাচ্চাদের জন্য এবারের পূজায় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতারও আয়োজন ছিল।

অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পরিবেশনার মাঝে বিপিসিএসের সাধারণ সম্পাদক উৎপল বোস ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পূর্ণেন্দু জ্যোতি পাল তাদের শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ বক্তব্য দেওয়ার জন্য দুই দুইবার মঞ্চে ওঠেন। অতিথি, সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক সবাইকে একসঙ্গে বক্তব্য দেওয়ার ব্যবস্থা না করে, বিভিন্ন পর্বের ফাঁকে ফাঁকে এঁদের বক্তব্যগুলো ভাগ করে দেওয়ার আইডিয়াটি ভালো লেগেছে। তবে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগত যদি আমন্ত্রিত অতিথি ও বিপিসিএসের পক্ষ থেকে তিনজন না উঠে একজন বক্তব্য দিতেন। প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী চলা এই অনুষ্ঠানটির বিভিন্ন পর্ব পরিচালনার করার জন্য চম্পক চক্রবর্তী, অঞ্জন দাশ, শুক্তিকা বোস, সুমিত মজুমদার ও জ্যোতি মিত্র—পাঁচজন উপস্থাপকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এতজন উপস্থাপকের উপস্থিতি নিশ্চয়ই খুব ভালো একটি দিক কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি দুজন উপস্থাপক হলেই ভালো হতো। তারা দুর্গাপূজার মাহাত্ম্য ও ইতিহাসের ওপর, গল্পের মতো করে একটি স্ক্রিপ্ট ঠিক করে নিতে পারতেন। সকল পারফরমারদের তাদের পারফরমেন্সের ধরনের ওপর ভিত্তি করে সেখানে যোজন করে দিয়ে পুরো অনুষ্ঠানটি দিয়ে দুর্গা পূজার একটি গল্প বলে যেতে পারতেন। যেহেতু বিপিসিএসের পারফরমারের অভাব নেই, সেখানে এই কাজটি করাটা খুব দুরূহ হবে বলে মনে হয় না।

তিন.

অনুষ্ঠানের যখন সমাপ্তি ঘোষণা করা হলো তখন ঘড়িতে রাত প্রায় ১০টা। হাইওয়ে ধরে বাসায় ফিরছি, শৈশবে ফেলে আসা হাজারো স্মৃতি মনের ওপরে আছড়ে পড়ছে। সে সময়ের পূজা ছিল সম্প্রীতির পূজা। ধর্ম পালন করাকে ছাপিয়ে দুর্গাপূজা হয়ে উঠেছিল সর্বজনীন বাঙালি সংস্কৃতির এক মিলনমেলা। নিরন্তর শান্তি-সম্প্রীতির আকাঙ্ক্ষা বুকে নিয়ে দুর্গোৎসবে মেতে ওঠা তরুণ তরুণীরা হয়ে উঠত উচ্ছল। হিন্দু-মুসলমান একই গ্রামে পাশাপাশি বসবাস করত। হিন্দুদের উলুধ্বনিতে মুসলমানের যেমন অসুবিধা হতো না, ঠিক তেমনি মুসলমানদের আজানের ধ্বনিতেও হিন্দুদের সমস্যা হতো না। সমাজে দুই ধর্মের লোকেরাই এগুলোকে খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখত। মেনেও চলত। আমাদের জয়শ্রীতে আমরা একই নদীর, একই ঘাটে হিন্দু মুসলমান একসঙ্গে গোসল করতাম।

লগান কমিউনিটি হলে দেখে আসা দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গে আমার শৈশবের দুর্গার সাদৃশ্য খুঁজছিলাম। হ্যাঁ সাদৃশ্য তো আছেই-দুই প্রতিমাই দুর্গা। দুই ক্ষেত্রেই তাঁর দশ হাতে দশটি অস্ত্র নিয়ে অধার্মিক, অসত্য, অন্যায় অসুর, অসুন্দরকে বিনাশ করতে পৃথিবীতে এসেছেন। আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে, আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বলাই নদীর তীরে বসে কোনো এক পূজার সময় মনোজ বলেছিল, আত্মকেন্দ্রিকতা, অন্যায়, অত্যাচার আর অসত্যের বিরুদ্ধের নীতিই দুর্গার নীতি। তার এই কথাটি আজকের প্রেক্ষাপটে কতটুকু সত্য তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।


Link: This article was originally published here