Article
তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম
বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকবেন সকলের অন্তরে
|
তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম

এক মহানায়ক এসেছিলেন, অনেক বছর আগে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও জীবনানন্দের এই বাংলায়। তাঁকে আমরা বঙ্গবন্ধু নামে ডাকতাম। তিনি দিয়ে গেছেন বাংলাদেশ নামক একটি দেশ, একটি পতাকা।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫। জাতির জীবনে এক কলঙ্কময় দিন। সেই দিন জাতির এই শ্রেষ্ঠতম সন্তানকে সামরিক বাহিনীর কিছু উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তা সপরিবারে হত্যা করেছে।

কীভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল তা এখন কমবেশি আমরা সবাই জানি। কিন্তু যে বিষয়গুলো আমাদের সামনে পরিষ্কার নয়, তা হলো বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনা দেশের সাধারণ মানুষ কীভাবে নিয়েছিল? এই অমানবিক, ভয়ংকর ঘটনা তাদের কীভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল? বঙ্গবন্ধু যাঁদের অধিকার আদায়ের জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করে গেছেন, জেল–জুলুম অত্যাচার সহ্য করেছেন, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যাঁদের কল্যাণ ছিল তাঁর ব্রত, সেই মানুষগুলো তাঁর হত্যাকে কীভাবে নিয়েছিলেন? একজন কৃষক কীভাবে নিয়েছিলেন? একজন মজুর কীভাবে নিয়েছিলেন? একজন সাধারণ অফিস কর্মচারী বা কর্মকর্তা কীভাবে নিয়েছিলেন?

এখানে একটি ছোট ঘটনা বলি। মহিবুল আলম তাঁর ‘তাল পাতার পুথি’ উপন্যাসের ভূমিকাতে ঘটনাটি লিখেছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দিনের সকালবেলার ঘটনা। এই অংশটি মহিবুল আলমের বই থেকে তুলে দিলাম—‘একজন বালকের ছয় বছরের ঘটনা তেমন মনে থাকার কথা নয়, কিন্তু আমার ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের ঘটনা স্পষ্ট মনে আছে। দিনটা ছিল শুক্রবার। বাবা তখন গ্রামের বাড়ি মুরাদনগরে। তিনি বেশ কয়েক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে বাড়িতে এসেছিলেন। এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই তিনি হেডঅফিস থেকে একটি জরুরি টেলিগ্রাম পান। টেলিগ্রামে লেখা, বাবা চাকরিতে প্রমোশন পেয়েছেন, আর তাঁকে দুই দিনের মধ্যে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেজবাড়ি কলোনির মনু নদী প্রজেক্টে গিয়ে যোগদান করতে হবে।

বাবা টেলিগ্রামটি পান ১৯৭৫ সালের ১৩ই আগস্ট। তিনি ১৫ই আগস্ট সকালে মৌলভীবাজারের উদ্দেশে রওনা দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ওদিকে আমার মন মানছিল না। বাবা বাড়িতে চার সপ্তাহ থাকার কথা বলে হুট করে চলে যাবেন বলে আমি কেঁদেকেটে অস্থির।

আগস্টের ১৫ তারিখ সকাল আটটায় বাবা প্যান্ট-শার্ট পরে ব্যাগ হাতে রওনা দেন। আর আমি পেছনে পেছনে অনবরত কাঁদছি। ঠিক তখনই জাহাঙ্গীর নামে আমার এক চাচাতো ভাই দৌড়ে এসে বাবাকে খবর দেন, বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলা হয়েছে! …. দেশে নাকি সামরিক আইন জারি হয়েছে!

“বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলা হয়েছে!’”—তৎক্ষণাৎ এ সংবাদ শোনার পর আমার বাবার হাত থেকে ব্যাগটা আপনা-আপনি পড়ে যায়। তারপর কীসের চাকরি, কীসের প্রমোশন! বাবা যেন দিগ্‌বিদিক হারিয়ে মালেক ডাক্তারের ফার্মেসির দিকে দৌড়াতে শুরু করেন! তখন আমাদের বাড়ির রেডিওটা ছিল নষ্ট। আমাদের বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে ছিল মুরাদনগর বাজার। মুরাদনগর বাজারে মালেক ডাক্তার ছিলেন আমার বাবার বন্ধু। গ্রামের বাড়িতে এসে মুরাদনগর বাজারে গেলে বাবা মালেক ডাক্তারের ফার্মেসিতেই সময় কাটাতেন বেশি। সেখানে তিনি রেডিওতে সংবাদ শুনতেন, আগের দিনের ইত্তেফাক পড়তেন।

সে দিনের দৃশ্যটা ছিল,…আমাদের গ্রামের বড় আইল। সেই বড় আইল ধরে আমার বাবা পুব মুখো হয়ে দৌড়াচ্ছেন। বাবার কাঁধে আমি। বাবা দৌড়াচ্ছেন আর দিশেহারার মতো বলছেন, “হায় হায়! এটা কি হলো!…বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলল? হায় হায়, হায় হায়!”’

সাধারণ মানুষদের হৃদয়কে এ’ভাবেই টুকরা টুকরা করে দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যা সংবাদ।
সারা বাংলাদেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল খুনিদের উন্মত্ততা ও অট্টহাসিতে।

খন্দকার মোস্তাকের প্রেতাত্মারা চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুমুক্ত দেশ। বাংলাস্থান। কিন্তু ওরা ভুলে গিয়েছিল যে গ্রামে বঙ্গবন্ধু একবার গিয়েছিলেন, যে শহরে একবার তিনি হেঁটেছিলেন, যে জেলায় তিনি একবার মিছিল করেছিলেন—সেখানেই তিনি জ্বালিয়ে গেছেন এক অনির্বাণ শিখা। যে শিখা লাখো মানুষের ভগ্নহৃদয়ে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে।

মহিবুল আলমের বাবার মতো অসংখ্য মানুষ হৃদয়ে ধারণ করে আছেন বঙ্গবন্ধুকে। শোকবহ এই দিনে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।


Link: This article was originally published here

Go to Top