Article
পুরোনো সেই দিনের কথা ভুলি কি করে হায়
সাস্টিয়ান পুনর্মিলনীর স্মৃতিচারণ
|
পুরোনো সেই দিনের কথা ভুলি কি করে হায়

আমি সব সময় আড্ডাপ্রিয় মানুষ। খুব কম বয়স থেকেই আড্ডার প্রতি একটা বিশেষ ঝোঁক ছিল। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে আড্ডাটা একটি নেশার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এমন কোনো বিষয় নেই আমাদের আড্ডায় স্থান পেত না। বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি সিনেমা, চিত্রনায়িকা ময়ূরী বা ক্যাটরিনা কাইফের নাচ, ক্রিকেট, রাজনীতি, সদ্য পড়া কোনো বই, কবিতা, গল্প, ক্লাসের বা পাড়ার মেয়েরা—কী না থাকত আমাদের আড্ডায়! এই আড্ডাপ্রিয় আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, সিনিয়র ও জুনিয়রদের নিয়ে একটি পুনর্মিলনের কথা শুনি তখন কি বসে থাকতে পারি?

সাস্টিয়ান পুনর্মিলনীর একটি দৃশ্যসাস্টিয়ান পুনর্মিলনীর একটি দৃশ্য

২০১৩ সালে আমরা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা সিডনিতে একটি পুনর্মিলনের আয়োজন করেছিলাম। সেখানে শ খানেক সাস্টিয়ান জড়ো হয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় এবারও আমরা একটি পুনর্মিলনী আয়োজনের উদ্যোগ নিলাম। সিডনি প্রবাসী আমাদের কয়েকজন সিনিয়র সাস্টিয়ান মূল উদ্যোগটা নিলেন। আমরা দল বেঁধে কাজে লেগে গেলাম। চাকরি, সংসার সামলিয়ে প্রবাসের ঘড়িধরা ব্যস্ত এ জীবনের রেসে এরকম অনুষ্ঠান করা অনেক কঠিন কাজ। মাস খানিকের প্রস্তুতি শেষে গত ১১ মার্চ সিডনির সেডান পার্কের গ্লেনফিল্ড কমিউনিটি হলে হলে গেল আমাদের সেই প্রত্যাশিত ‘সাস্টিয়ান পুনর্মিলনী ২০১৭’।

‘সাস্টিয়ান’ এমন একটি শব্দ, যার সর্বত্র জুড়ে আছে দুটি পাতা একটি কুড়ির বিভাগ সিলেটে অবস্থিত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের প্রাণের মেলবন্ধন, আবেগ, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক অচ্ছেদ্য বন্ধন। বিদেশে বসবাসরত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কাছে এই অনুভূতি আরও গভীর। সাস্ট বলতে ভেসে ওঠে সবুজ এক কিলো, গাছগাছালিতে পূর্ণ ছায়াময় এক ক্যাম্পাস, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য, চেতনা ৭১, গোল-চত্বর, পাহাড়ের ওপর অবস্থিত নয়নাভিরাম শহীদ মিনার, শাহপরান হল কিংবা লেডিস হলের গামলা ভর্তি ডাল, মদিনা মার্কেটের মেস, মামাদের সারি সারি টং দোকান, বাসে বাদুরঝোলা কিংবা সেলিব্রেটি লেখক, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ জাফর ইকবাল স্যার, খলিলুর রহমান স্যার, মিরাজ উদ্দীন মণ্ডল স্যার, জয়নাল স্যারের নীতি ও আদর্শ। ‘পুরোনো সেই দিনের কথা ভুলি কি করে হায়, ও সে চোখের দেখা, প্রাণের সে কথা কি ভোলা যায়’। আসলেই ভোলা যায় না। এই অনুভূতিগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে, আরও গভীরভাবে জিইয়ে রাখাই ছিল এবারের পুনর্মিলনের মূল উদ্দেশ্য। নিয়মিত সাহিত্যের কাগজ বের করা, সাস্টিয়ানদের কেউ যদি কোনো ব্যয়বহুল রোগে ভোগেন এবং তার যদি সামর্থ্য না থাকে, তাহলে আমরা কীভাবে তার চিকিৎসায় সহযোগিতা করব অথবা বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কীভাবে আমরা এগিয়ে যাব, এর জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরিও এই পুনর্মিলনের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল।

সাস্টিয়ান পুনর্মিলনীর একটি দৃশ্যসাস্টিয়ান পুনর্মিলনীর একটি দৃশ্য

অপার্থিব অনাবিল আনন্দের এই মিলনমেলায় অংশগ্রহণ করেন প্রথম ব্যাচ থেকে ২৩তম ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। এই পুনর্মিলনীতে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন প্রায় ১৫০ জন সাস্টিয়ান ও তাদের পরিবার পরিজনেরা। অ্যাডিলেড থেকে আসেন শ্যামল দা। ক্যানবেরা থেকে তাপস দা ও পান্না আপাসহ অনেকেই। ব্রিসবেন থেকে গিয়েছিলাম আমি, মৃদুল দা আর মাসুদ। আড্ডা আর স্মৃতি রোমন্থনের একটা বেপরোয়া অনুভূতি নিয়ে ব্রিসবেনের থেকে আমরা যখন বের হই, তখন মনে হচ্ছিল গন্ডগোলের কারণে আমাদের প্রিয় সাস্ট অনেক দিন বন্ধ থাকার পর এইতো আগামীকাল খুলবে। ক্লাস শুরু হবে। আমরা ক্যাম্পাসে যাচ্ছি। মাঝের পনেরো-ষোলো বছর আমাদের চিন্তা থেকে উধাও হয়ে গেল। নাড়ির টান একেই বলে! কেমন একটি অবর্ণনীয় অনুভূতি। মাঝে মাঝে অবিশ্বাস লাগে এরই মধ্যে এত সময় বয়ে গেছে!

সকাল নয়টা হতে শুরু হয় সাস্টিয়ানদের আগমন। চলতে থাকে মঞ্চ প্রস্তুতি। মঞ্চের দুই পাশ ছিল লাল ইটের দেয়াল, যা স্মরণ করিয়ে দেয় মায়া ভরা সাস্টের সেই ভবনগুলো। উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত সাস্টের প্রথম দিকের শিক্ষক মাকসুদুল বারী স্যার। পুনর্মিলন আয়োজক কমিটির সচিব লিপুর উপস্থাপনায় শুরু হয় পুনর্মিলনের যাত্রা। আমাদের বন্ধু ফরিদের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘পুনর্মিলন স্মারকগ্রন্থের’ মোড়ক উন্মোচন করেন বারী স্যার। সম্পাদকের বক্তব্যে ফরিদ এই সাহিত্যের কাগজটিকে অস্ট্রেলিয়া থেকে কীভাবে নিয়মিত বের করা যায় তা নিয়ে তার পরিকল্পনার কথা আমদের শোনায়। এই কাগজটি লেখা সংগ্রহের কিছু কাজে আমি জড়িত ছিলাম। আমাকে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলে দেওয়া হয়েছিল আমি যেন জাফর ইকবাল স্যারের একটি লেখা অবশ্যই সংগ্রহ করি। অনেক সংশয় নিয়ে স্যারকে ইমেইল করেছিলাম। আমার ধারণা ছিল স্যার লেখা দিতে পারবেন না। তিনি অনেক ব্যস্ত থাকেন। তাও লেখা চেয়েছি পুনর্মিলন স্মারকগ্রন্থের জন্য। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে পরের দিনেই স্যার অপূর্ব সুন্দর একটি লেখা পাঠিয়ে দিলেন। লেখাটি ছিল ২০১৩ সালে স্যারের মেলবোর্নে প্রথম সফরের ওপর।

সাস্টিয়ান পুনর্মিলনীর একটি দৃশ্যসাস্টিয়ান পুনর্মিলনীর একটি দৃশ্য

এই গ্রন্থে সাস্ট ক্যাম্পাসের প্রাক্তন ও বর্তমান কয়েকজন স্বনামধন্য লেখকের লেখার পাশাপাশি অনেকের স্মৃতিচারণমূলক লেখাও স্থান পেয়েছে। টি এম আহমেদ কায়সার, মুহম্মদ ইমদাদ, এমদাদ রাহমান, বিপ্রজ্যোতি দত্ত বাপ্পা, হাসান শাহরিয়ার চৌধুরী মিতুল, মুর্শিদা জামান, শেখ লুবানা, ফাথহুম চৌধুরী রাইম, কৌস্তুভ শ্রী, জিএম হারুন অর রশিদ প্রমুখের লেখার সঙ্গে আমার নিজেরও একটি লেখা স্থান পেয়েছে।

এরপর শুরু হয় আমার সঞ্চালনায় স্মৃতিচারণ পর্ব। সাস্টের দিনগুলিতে ফিরে যান প্রথম ব্যাচের বাপ্পা দা, দ্বিতীয় ব্যাচের মুর্শিদা জামান, তৃতীয় ব্যাচের মৃদুল কান্তি দাশ, চতুর্থ ব্যাচের সুমিতা দে, পঞ্চম ব্যাচের শ্যামল দাস ও ঝুটন আচার্যী, ষষ্ঠ ব্যাচের ব্রাজেল মুহিব, সপ্তম ব্যাচের দিদার হক, অষ্টম ব্যাচের সুব্রত সরকার আনন্দ, ১৪তম ব্যাচের সাজেদ আজিজ অমি ও ১৮তম ব্যাচের পুস্পা পালসহ আরও অনেকেই। তাদের অসম্ভব আবেগ ও হাস্যরসেপূর্ণ স্মৃতিচারণ চলে প্রায় ঘণ্টাখানেক। ক্যানসারে আক্রান্ত সাস্টিয়ান আল আমিনের চিকিৎসার জন্য তহবিল সংগ্রহে সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এবং অস্ট্রেলিয়া সাস্টিয়ানদের মূল প্ল্যাটফর্ম গঠনের সমন্বয়কের দায়িত্ব নিতে এলামুল কবির খান সুদান ভাইয়ের সম্মতির কথা ঘোষণা করে আমি এই পর্বের সমাপ্তি টানি।

সাস্টিয়ান পুনর্মিলনীর একটি দৃশ্যসাস্টিয়ান পুনর্মিলনীর একটি দৃশ্য

স্মৃতিচারণের পর শুরু হয় লাঞ্চ ও নেটওয়ার্কিং পর্ব। সুদান ও মিতুল ভাইয়ের ব্যবস্থাপনায় আয়োজন করা হয় ভুঁড়িভোজ। বুফে খাবার মেন্যুতে ছিল ঐতিহ্যবাহী বিরিয়ানি, চিকেন রোস্ট, খাসির রেজালা, ভেজিটেবল ও রুটিসহ অনেক কিছু। খাবার প্লেট হাতে ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত সবাই মেতে উঠি আড্ডায়। এ যেন সাস্টের টং দোকানে সারিবদ্ধ হয়ে দুপুরের খাবার সেরে নেওয়া। নেট ওয়ার্কিংয়ের নামে আমাদের অনেকেই চলে গিয়েছিলাম আমাদের সেই বন্ধুদের খোঁজে, যাদের সঙ্গে যৌবনের শুরুর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পাঁচটি বছর কেটেছিল। কে কোথায় আছে? কী করছে? ঘুরে ফিরে আড্ডায় চলে আসছিল সেই হারিয়ে যাওয়া মুখগুলো!

একই সঙ্গে চলতে থাকে অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় রিস ফটোগ্রাফির সৌজন্যে ফটোসেশন, ব্যাচ ভিত্তিক ও সম্মিলিতভাবে বন্দী হই স্মৃতির ফ্রেমে। বিকেলের শুরুতে সুমিতা দি ও তার মেয়ের যৌথ গানের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সিডনির স্থানীয় একটি বাংলা ব্যান্ড আমাদের সময়ের সব জনপ্রিয় গান গেয়ে মাতিয়ে রাখে সবাইকে। গানের এই পর্বে আসেন আমাদের আরেক সাস্টিয়ান—রাজিব। সে নাচে-গানে উন্মাতাল করে তোলে সবাইকে। একে একে পরিবেশন করে আজম গানের বাংলাদেশ, মালেকা-সালেকা, জেমসের বাংলাদেশ, কবিতা ইত্যাদি। প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অন্তরে ধারণ করে রাখার মতো। সন্ধ্যা গড়িয়ে আসলেও যেন শেষ হতে চাইছিল না আমাদের এই প্রাণ-বন্ধন। সুর তাল ছন্দের মাতালে ফিরে গিয়েছিলাম সাস্টের সেই দিনগুলোতে। রিম, শিকড়, থিয়েটারের প্রোগ্রামের স্মৃতি মনে ভাসতে থাকে। ভুলেই গিয়েছিলাম ব্রিসবেনে আমার ল্যাবের কথা, ফেলে আসা অনেক কাজের কথা, মনে হচ্ছিল এভাবেই চলতে থাকুক না, শেষ যেন না হয়।

সাস্টিয়ান পুনর্মিলনীর একটি দৃশ্যসাস্টিয়ান পুনর্মিলনীর একটি দৃশ্য

তারপরও শেষ হয়ে গেল আমাদের মিলনমেলা। পুরো একটি দিন চোখের পলকে কীভাবে শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক গণেশ দা সমাপনী বক্তব্যে সবাইকে ধন্যবাদ দেন। বিশেষ করে সাজ্জাদ সিদ্দিকী, ফরিদ আলম, শাহরিয়ার চৌধুরী মিতুল, সাইফুল ইসলাম, আমিন খান, অপু সাহা, সাদিকুল ইসলাম হিমেল, হাসান আল বারী নিপু ও মঞ্জুর হোসেন তাদের পরিশ্রমের কথা তিনি কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করলেন। ফেরার সময় অনেক কষ্টে চোখের জল আটকেছি। বারবার মনের সেলুলয়েডে একে একে ভাসছিল পনেরো বছর আগে ফেলে আসা হাজারো স্মৃতি।

সাস্টিয়ান পুনর্মিলনীর একটি দৃশ্যসাস্টিয়ান পুনর্মিলনীর একটি দৃশ্য

ব্রিসবেনে পৌঁছানোর পর যখন হাইওয়ে দিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে ফিরছি, বারবার পুনর্মিলনীতে দেখা মুখগুলো চোখে ভেসে উঠছিল। একসময় বুঝলাম গলায় শক্ত কী যেন আটকে আছে। গরিব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গরিবের টাকায় পড়ে উচ্চশিক্ষিত হয়ে আজ অন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি। এই অপরাধবোধ কোথায় রাখি? স্বার্থপরের মতো নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত আছি। বন্ধুহীন জীবন, বৃদ্ধ বাবা–মাকে দেশে ফেলে এই দেশে কীসের জন্য পড়ে আছি? কীসের জন্য আমার প্রিয় দেশকে, দেশের মানুষের সেবা করতে পারছি না? চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ব্রিসবেনের আকাশও যেন আমার দুঃখে আজ বিরহী। সমস্ত আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। অতি পরিচিত বৃষ্টি। এমন বৃষ্টিতো আমাদের সিলেটেই হয়। এমন বৃষ্টিতে সাস্টের এক কিলোতে কত হেঁটেছি! হাইওয়ের পাশে গাড়ি থামিয়ে আমি বৃষ্টিতে ভিজতে থাকি। বৃষ্টির আমার চোখের জলকে মিশিয়ে নেয় তার সাথে। তীব্র অপরাধবোধ আর উচ্ছৃঙ্খল স্মৃতিগুলো কিছুতেই শান্ত হয় না, হতে চায় না!


Link: This article was originally published here

Go to Top