Article
কুইন্সল্যান্ডে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন
‘বাংলাদেশ’ নামের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যটির রচয়িতার প্রতি কুইন্সল্যান্ডে শ্রদ্ধা নিবেদন
|
কুইন্সল্যান্ডে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন

মুক্ত বিহঙ্গের মতো জীবনযাপনে অভ্যস্ত স্বাধীনতা প্রিয় বাঙালি জাতি কখনো কারও অধীনে থাকতে চায়নি। যার ফলাফল আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। আর এই ‘বাংলাদেশ’ নামের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যটির রচয়িতা হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর ডাকে স্বাধীনতা নামক যে মহাকাব্যটি ছিনিয়ে আনতে বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার জন্য তাদের চরম মূল্যও দিয়ে হয়েছে। নয় মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনারা বাংলাদেশকে একদম নিঃস্ব করে দিয়ে গিয়েছিল। ৩০ লাখ মানুষ মেরে এরা শুধু পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্যতম গণহত্যাই করেনি, ২ লাখ মা-বোনকেও এদের পাশবিকতার চরম শিকার হতে হয়েছিল। ধ্বংস করে গিয়েছিল সমগ্র অবকাঠামো, পুড়িয়ে দিয়েছিল লাখ লাখ বাড়ি ঘর। ব্যাংকের সমগ্র টাকা নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানে।

স্বাগত বক্তব্য দিচ্ছেন মুহম্মদ আলাউদ্দিনস্বাগত বক্তব্য দিচ্ছেন মুহম্মদ আলাউদ্দিন

সাড়ে ৭ কোটি মানুষের যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে পুনর্গঠনের দায়িত্বও নিতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে। যে লোকটি সারাটি জীবন ‘sincerity of purpose and honesty of purpose’ ভিত্তি করে চলেছেন, পঞ্চান্ন বছরের জীবনে কোনো অপরাধ না করেও শুধু জনগণের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে যিনি ১৩ বছরের অধিক সময় জেল খেটেছেন। একটি পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতা এনে দেওয়ার জন্য আস্তে আস্তে প্রস্তুত করেছিলেন। আর ১৯৭১ সালে তিনি বাঙালিদের এমন আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন যে, তিনি যা বলতেন বাঙালি তাই শুনত। তাঁর নিজের কণ্ঠ তখন বাঙালির কণ্ঠ হয়ে প্রতিধ্বনিত হতো।

বক্তব্য দিচ্ছেন তপন কুমার সাহাবক্তব্য দিচ্ছেন তপন কুমার সাহা

বাঙালির সেই অবিসংবাদিত নেতা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ নির্মাণে যে খুব দরদি, কর্মোদ্যমী ও সৎ হবেন তা মোটামুটি ধারণার মধ্যেই ছিল। পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধকার সেলের দরজার সামনে বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজের কবর খোঁড়া দেখেছিলেন। সামরিক আইনে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। ঝুলিয়ে মারা হবে। এমন ভয়াবহ মানসিক পীড়নের মধ্য থেকে মুক্তি পেয়েই দেশ পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কাজে তিনি যে প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর দরদ নিয়ে কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিলেন তা চালিয়ে গিয়েছিলেন ১৫ আগস্টে তাঁকে সপরিবারে হত্যার আগের দিন পর্যন্ত।

কৃষি ও বায়োটেকনলজি সেক্টরে বাংলাদেশের অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্যতার ওপর বক্তব্য দিচ্ছেন মুহম্মদ এম জে সিদ্দিকীকৃষি ও বায়োটেকনলজি সেক্টরে বাংলাদেশের অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্যতার ওপর বক্তব্য দিচ্ছেন মুহম্মদ এম জে সিদ্দিকী

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ও কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গত ১৯ আগস্ট শনিবার বিকেল ৪টায় কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইকোনমিকস ‘An Economic Case History of Bangladesh: Bangladesh’s Achievements, Challenges and Prospects’ নামে প্রেন্টিস ভবনে একটি সেমিনারের আয়োজন করে। বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা এ আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল সার্বিকভাবে বর্তমান বাংলাদেশের অবস্থান, সেইসঙ্গে পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোকপাত করা। পিনপতন নীরবতায় অনুষ্ঠানের এই পর্বের সঞ্চালিকা মৌরিতা মোসাদ্দেক সর্বপ্রথমেই রীতি অনুসারে অস্ট্রেলিয়া ভূখণ্ডের আদিবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং শ্রদ্ধা জানান। তিনি যখন মাইক হাতে দর্শকদের সামনে দাঁড়ালেন, তখন ডিজিটাল ব্যানারে বঙ্গবন্ধুর একটি দৃপ্ত ছবি ভেসে ওঠে। বঙ্গবন্ধু (যেন!) আমাদের দৃঢ় কণ্ঠে বলছেন—‘I did my part, now It’s your turn’.

বক্তব্য দিচ্ছেন শেখ শামীমুল হকবক্তব্য দিচ্ছেন শেখ শামীমুল হক

তাঁর স্মৃতি ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে মৌরিতা অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শুরু করেন। এই পর্বের শুরুতেই তিনি অবনি মাহবুব, সুচরিতা কর্মকার, জ্যোতিষ দাস জয়, গোপাল বোস, লিজিয়া সালাম ও শর্মি বোসকে আমাদের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করতে ডাকেন। জাতীয় সংগীত শুনলে প্রবাসী বাঙালিদের যেমনটি হয়, সবাই গলা ফাটিয়ে এই গানটি গায়। আর এক সময় নিজের অজান্তেই খেয়াল করেন তাদের গলা ভারী হয়ে উঠেছে। জলভরা ঝাপসা চোখে কত কিছু ভেসে ওঠে। হাতড়ে বেড়ায় ফেলে আসা দেশ, দেশের স্মৃতি। এখানে দৃশ্যটি আরও করুণ! বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ, আমাদের প্রাণের সংগীত—সব একাকার হয়ে কেমন যেন দুঃখ আর আবেগে পূর্ণ ভারী পরিবেশ!

আবৃত্তি করছেন শাহেদ সদরুদ্দিনআবৃত্তি করছেন শাহেদ সদরুদ্দিন

সেমিনারে এই পর্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইকোনমিকস এর সহযোগী অধ্যাপক ও অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক ড. মুহম্মদ আলাউদ্দিন। তিনি তাঁর বক্তব্যে কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে এই অনুষ্ঠান করার সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান। ১৯৭১ সালে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তখনকার সময়ে দেশি বিদেশি পণ্ডিতদের বিভিন্ন মন্তব্য ও ভবিষ্যদ্বাণীর তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, যারা বলত ‘Bangladesh as a test case for development’, ‘Can Bangladesh survive?’ ‘Bangladesh as an international basket case’, তাদের সব ধারণা আজ মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। স্বাধীনতার চার দশকের মাথায় বাংলাদেশ তার অর্থনীতিকে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত উর্ধগামী অর্থনীতিতে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্টের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ আজ পুরোপুরি সফল একটি রাষ্ট্র। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতার উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা ব্রিজের কথা গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করেন। তিনি অর্থনীতি, কৃষি-বায়োটেকনোলজি ও এনার্জি সেক্টরে বাংলাদেশের সফলতা, চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশাকে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত এই সেমিনারকে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার কারিগর বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করে তাঁর স্বাগত বক্তব্য শেষ করেন।

সমাপনী বক্তব্য দিচ্ছেন মোসাদ্দেক শহীদ লাইলাকসমাপনী বক্তব্য দিচ্ছেন মোসাদ্দেক শহীদ লাইলাক

এর পর পরেই তিনি তার জন্য নির্ধারিত ‘Overview of Bangladesh’s socio-economic achievements, challenges and prospects’ বিষয়ের ওপরে জ্ঞানগর্ভ সেমিনার পেপার উপস্থাপন করেন। মুহম্মদ আলাউদ্দিনের বক্তব্যে এ কথা স্পষ্ট ছিল যে, স্বাধীনতা পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল বাঙালির আর্থসামাজিক মুক্তির অনন্য নির্দেশনা। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ দিক-নির্দেশনায় দেশ গঠনের মাত্র ১০ মাসের মাথায় গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা ও সমাজতন্ত্রের চারটি স্তম্ভ মূলে গড়ে ওঠা বাংলা ভাষার আধুনিক সংবিধানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সকল মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। বঙ্গবন্ধুর সুনেতৃত্বের প্রতিফলন ঘটে দেশসেরা অর্থনীতিবিদদের নিয়ে তৈরি করা দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে (১৯৭২-১৯৭৬), যেখানে অগ্রাধিকার পায় শিক্ষা, কৃষি, অবকাঠামো পুনর্বাসন ও নির্মাণ এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধুকে কাপুরুষোচিতভাবে হত্যা করে, তাঁর সোনার বাংলা গঠনের উদ্যোগকে যে থমকে দেওয়া যায়নি, তা মুহম্মদ আলাউদ্দিন সুস্পষ্ট তথ্য উপাত্তসহ দেখিয়ে দেন। আমরা জানতে পারি কীভাবে ধাপে ধাপে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজকের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিপুল সামাজিক অগ্রগতি অর্জন করেছে।

অনুষ্ঠানের এই পর্যায়ে কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইনফরমেশন টেকনোলজি ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ড. তপন কুমার সাহা ‘Bangladesh’s energy security: Achievements, challenges and prospects’ ওপর তার মূল্যবান বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো কীভাবে বাংলাদেশের এনার্জি সেক্টরে ভূমিকা রাখছে তার তুলনামূলক একটি চিত্র তুলে ধরেন। বাংলাদেশে গ্যাসের পাশাপাশি সৌরশক্তি যেভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তিনি তার ভূয়সী প্রশংসা করেন্। তপন কুমার সাহা দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট সমাধানে দেশের নবায়নযোগ্য ও অনবায়নযোগ্য শক্তির সমন্বিত ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে তাঁর গবেষণালব্ধ পরামর্শ প্রদান করেন। যেহেতু বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় জায়গার পরিমাণ অনেক কম, উপরন্তু বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েই চলেছে, তাই তিনি বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে কানেকটিভিটির মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন। এখানে উল্লেখ্য, তপন কুমার সাহা তাঁর এনার্জি সেক্টরের ওপর গবেষণার জন্য অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর অনেক জায়গায় এক সুপরিচিত নাম। তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, বিভিন্নভাবে তিনি তার এই প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য কাজে লাগাচ্ছেন এবং সামনেও বাংলাদেশের উন্নতিতে ভূমিকা রাখতে চান।

জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করছেন অবনি মাহবুব, সূচরিতা কর্মকার, জ্যোতিষ দাস, গোপাল বোস, লিজিয়া সালাম ও শর্মি বোসজাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করছেন অবনি মাহবুব, সূচরিতা কর্মকার, জ্যোতিষ দাস, গোপাল বোস, লিজিয়া সালাম ও শর্মি বোস

এরপর মঞ্চে আসেন গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার ড. মুহম্মদ জে এ সিদ্দিকী। তার আলোচ্য বিষয় ছিল ‘Agricultural Science and Biotechnology in Bangladesh: Achievements, challenges and prospects’. তিনি শুরুতেই, বঙ্গবন্ধু কীভাবে অল্প সময়ের ভেতরে দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করার পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্ব দিয়েছেন তা তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধু দেশের অন্যতম শীর্ষ বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে একটি বিজ্ঞানমনস্ক, আধুনিক ও যুগোপযোগী একীভূত ধারার শিক্ষানীতি অনুমোদন করেন, যা সদ্য জন্ম নেওয়া যেকোনো দেশের বিজ্ঞান শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অনন্য এক আদর্শ। একাত্তরের পর জনসংখ্যা কয়েক গুন বাড়লেও কৃষিজমি হয়েছে অর্ধেকের চেয়েও কম। অথচ বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যশস্য রপ্তানিও করছি আমরা। মুহম্মদ জে এ সিদ্দিকী মনে করেন কৃষি খাতে সরকারের সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা ও অর্থায়ন; পাশাপাশি হাজারো মেধাবী নিবেদিতপ্রাণ গবেষকদের উদ্ভাবনী শক্তিই পথ দেখিয়েছে এ সফলতা অর্জনে। তিনি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। সীমিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, নতুন নতুন এসব উদ্ভাবন দিয়ে উচ্চ ফলনশীল এবং রোগবালাই মুক্ত ফসল ফলিয়ে বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বের কাছে রোল মডেল। অন্যদিকে আইসিডিডিআরবি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োটেকনোলজি গবেষণার কথা তুলে ধরেন তিনি। পাট কিংবা পেঁপের জিনের রহস্য উন্মোচনের মতো কিছু যুগান্তকারী সাফল্য আমাদের থাকলেও, সার্বিকভাবে বায়োটেকনোলজি গবেষণায় এখনো কিছুটা পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। মুহম্মদ জে এ সিদ্দিকী মনে করেন এ ক্ষেত্রে প্রণোদনা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে, বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরাও সমান তালে অন্যদের সঙ্গে পাল্লা লড়বে।

দর্শকদের একাংশদর্শকদের একাংশ

এই পর্বের শেষ বক্তা ছিলেন বঙ্গবন্ধু কাউন্সিল অস্ট্রেলিয়ার সভাপতি শেখ শামীমুল হক। তিনি ‘Bangladesh and Bangabandhu: What can the young generation learn?’ বিষয়ে বলতে গিয়ে প্রায় ৩০ মিনিট হলভর্তি দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধের মতো আটকে রাখেন। নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে কয়েকটি লাইন পড়ে শোনান। যেখানে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন—‘একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানব জাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্ত সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি ও অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।’ তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর জীবন ও সংগ্রাম মানেই হলো স্বাধীন সার্বভৌম ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন। ৫৫ বছরের জীবনে তিনি সাড়ে ১৩ বছর বিনা বিচারে, শুধু বাঙলার মানুষের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে জেল খেটেছেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই জাতিকে মুক্তির স্বাদ দিতে পারলেও একে অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি স্বনির্ভর করার আগেই তাঁকে প্রাণ দিতে হলো। তিনি বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম ও কর্মের প্রতি বেগম মুজিবের অকুণ্ঠ সমর্থন ও অবদানের কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

দর্শকদের একাংশদর্শকদের একাংশ

দুই.

একটা ছোট বিরতির পর অবনি মাহবুবের পরিচালনায় শুরু হয় অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্ব। প্রথমেই বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মের আবেগ এবং চিন্তা-ভাবনা নিয়ে একে একে কথা বলেন নুশিন আলম, মাহবুবুর রহমান বিপু, মাহমুদুল আলম অটল ও শাহেদ সদরুদ্দিন প্রমুখ। প্রত্যেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দেশকে আরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ছোট পরিসরে করা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল দেশাত্মবোধের মনোজ্ঞ পরিবেশনা। জ্যোতিষ দাস জয়, ড. গোপাল বোস ও সুচরিতা কর্মকারের রবীন্দ্র সংগীত আর দেশের গানের পর, উপস্থাপক অবনি নিজেই মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি’ গানটি পরিবেশনা করেন। অবনির দরদি কণ্ঠ মনে করিয়ে দেয় যে গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের লেখা আর অংশুমান রায়ের সুরে গাওয়া এ গান কোনোদিন পুরোনো হওয়ার নয়। গানটির কথায় আমরা আজও খুঁজে পাই, কেন শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম কিংবা বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবাদ পুরুষ। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশকে নিয়ে করা এ গানগুলোর সুরের মূর্ছনায় হৃদয়ে কেমন যেন বাঙালিত্বের এক শিহরণ বইয়ে দিয়ে যায়।

দর্শকদের একাংশদর্শকদের একাংশ

অনুষ্ঠানে একে একে আবৃত্তি করেন শাহেদ সদরুদ্দিন, শর্মিলা বোস, অজয় চক্রবর্তী ও শেখ শামীমুল হক। আর আবৃত্তিগুলো ছিল এক শব্দে ‘অসাধারণ’। কবিতার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দগুলো যেন মুক্তিযুদ্ধের এক একটা দ্রোহের প্রতিশব্দ হয়ে কানে বাজছিল। শর্মিলা বোস নির্মলেন্দু গুনের অনবদ্য সৃষ্টি ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতাটি আবৃত্তি করে গেলেন। কবিতাটি শেষ হলেও আমাদের ঘোর যেন কাটে না। মেনে নিতে কষ্ট হয়, বাংলাদেশের রূপকারকে কীভাবে পুরো পরিবারসহ ১৫ আগস্টের কালরাতে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। সেই ভয়ংকর আগস্টের কালরাতের কথা নিয়ে নির্মলেন্দু গুনের আরেকটি কবিতা ‘সেই রাতের কল্পকাহিনী’ শোনালেন অজয় চক্রবর্তী। অজয়ের ভরাট কণ্ঠে কবিতাটির একটা লাইন বুকে বিধতে লাগল বারংবার—‘মূল্যহীন শুধু তোমার জীবন, শুধু তোমার জীবন, পিতা।’ করুণা হলো নিজেদের প্রতি। যে মুজিব জীবনের বেশির ভাগ সময়টা জেলে কাটিয়েছেন, জীবনের প্রতিটা ক্ষণ আমাদের দিয়েছেন, তার প্রতিদান কি আমরা দিয়েছি? শাহেদ সদরুদ্দিন এরপর আবৃত্তি করলেন সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ কবিতাটি। তিনি যখন উচ্চারণ করছেন:
‘আপস করিনি কখনোই আমি-এই হলো ইতিহাস।
এই ইতিহাস ভুলে যাব আজ, আমি কি তেমন সন্তান?
যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান;’
তখন এত হতাশার ভেতরেও কিছুটা আশার আলো দেখতে পাই। সেমিনারের এ পর্যায়ে, বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি ঐতিহাসিক ডকুমেন্টারি দেখানো হয়। সমাবেশ স্থলের বাইরেও আয়োজকেরা একটা পোস্টার প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন। যেখানে ছবির মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের তুলে ধরা হয়। এ ধরনের ব্যবস্থা থাকার কারণে আমরা মনে করি, অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রবাসে বড় হওয়া শিশুরা অনুপ্রাণিত হয়েছে, অনেক কিছু জানতে পেরেছে।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্য রাখেন মোসাদ্দেক শহীদ লাইলাক। সেই নব্বইয়ের দশকে শুরুতে ব্রিসবেনে থিতু হওয়া লাইলাক অনেক দিন ধরেই এ রকম একটা আয়োজনের স্বপ্ন দেখতেন। এই সুন্দর আয়োজনকে সফলে যারা শ্রম দিয়েছেন তাদের ধন্যবাদ দিয়ে তিনি এখন থেকে প্রতি বছর বিভিন্ন পরিসরে এ রকম অনুষ্ঠান করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্যে বলেন, আগামী দিনে সুখী সমৃদ্ধ, আত্মমর্যাদাশীল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে হলে বঙ্গবন্ধুকে ভালো মতো জানতে হবে। তার জীবন ও কর্ম সম্বন্ধে গভীর গবেষণা, নিবিড় অধ্যয়ন ও তা থেকে অর্জিত শিক্ষা বাস্তবিক জীবনে প্রয়োগ করতে হবে।

সুচরিতা কর্মকার ও জাফরিন সুলতানা রিপাসুচরিতা কর্মকার ও জাফরিন সুলতানা রিপা

এই অনুষ্ঠান নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলো। প্রায় এক যুগ আগে এখানে আসা শহীদ সন্তান শাহেদ সদরুদ্দিন মন্তব্য করেন, প্রবাসে আসার পর এই প্রথম এত সংগঠিতভাবে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করলাম। এই অভিজ্ঞতা এখানে বেড়ে ওঠা আমাদের নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের ইতিহাস আর বঙ্গবন্ধুকে জানতে সাহায্য এবং একাত্তর আর পঁচাত্তরের ঘাতক মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে উদ্বুদ্ধ করবে। আমি চাইব এ ধরনের সেমিনার আরও হোক, প্রবাসেও আমরা রচনা করি লাল সবুজের প্রিয় বাংলাদেশ।

অবনি মাহবুব বলেন, তিনি গত ১২ বছরের প্রবাস জীবনে এ রকম অনুষ্ঠান আয়োজিত হতে দেখেননি। আর সে জন্যই হয়তো সেমিনারের আলোচকদের কাছে বাংলাদেশের দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার বর্ণনা আর পরে বঙ্গবন্ধুর স্মরণে বিভিন্ন পরিবেশনায় তিনি বারবার চোখের জল লুকিয়েছেন। অবনি আরও মনে করেন, এ ধরনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আগামী প্রজন্ম, বিভিন্ন অপশক্তির দেশ ও বঙ্গবন্ধু বিরোধী প্রচারণার জালে আটকাবে না, বরং সমুচিত জবাব দিতে শিখবে।
শিক্ষা ছুটিতে আসা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মাহবুবুর রহমান বিপু আরও যোগ করেন—ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য, সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রসমূহকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উপস্থাপন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্দীপনা জাগাতে এই রকম সেমিনার অনেক গুরুত্ব বহন করে থাকে। বিশেষকরে স্বাধীনতার পটভূমি ও স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম যেমন সঠিক ইতিহাস জানতে পারে পাশাপাশি একটি সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে করণীয় সম্পর্কেও অবগত হতে পারে।

এ ছাড়া উপস্থিত অনুপ সরকার, জ্যোতিষ দাস জয় ও শাহজালাল খান সবাই আশাবাদ ব্যক্ত করে মনে করেন, আজকের তরুণ প্রজন্মরা অনেক সচেতন, তারা সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে কাঁধে কাঁধ রেখে কাজ করবে।

আমরাও তাই মনে করি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার চোখে এক নতুন প্রত্যয় দেখে এটুকু বলতে পারি, ১৫ আগস্টের ঘাতকের দলরা বঙ্গবন্ধুকে হয়তো আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু যে বঙ্গবন্ধুর স্থান আমাদের হৃদয়ে, তাঁর মৃত্যু নেই। তাঁর আদর্শের পথ ধরে বাংলাদেশ ঠিকই পৌঁছে যাবে তাঁর সঠিক গন্তব্যে।


Link: This article was originally published here