Article
ব্রিসবেনে একখণ্ড লাল সবুজের বাংলাদেশ
ব্রিসবেনে একখণ্ড লাল সবুজের বাংলাদেশ
|
ব্রিসবেনে একখণ্ড লাল সবুজের বাংলাদেশ

অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম প্রধান নগরী ব্রিসবেনের কিয়ং পার্ক ২৪ এপ্রিল রোববার সেজেছিল বাঙালিদের সবচেয়ে বড় প্রাণের মেলায় বাংলা বর্ষবরণ উৎসবে। প্রায় তিন হাজারের বেশি মানুষের ঢল নেমেছিল মেলায়। এর আয়োজন ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল ব্রিসবেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন।

প্রচণ্ড রোদকে মাথায় নিয়ে মেলায় গিয়ে দেখি বিশাল কিয়ং পার্কের চারপাশে ২০-৩০টি স্টলে বাঙালি খাবার, গয়নাগাটি ও পোশাক আশাকের সমারোহ। কয়েকটি স্টলে ইলিশ পান্তা আর ভর্তার আয়োজনও দেখলাম। মেলায় ঢুকতেই কানে এল উপস্থাপকের ভরাট কণ্ঠের ঘোষণা—বর্ষবরণ শোভাযাত্রা শুরু হবে ঠিক ১২টা ৩০ মিনিটে। নানা রঙের কেতন উড়িয়ে, বাঁশি বাজিয়ে, ঢাক ও ঢোলের তালে তালে শোভাযাত্রা ঘুরবে কিয়ং পার্কের প্রান্তর। শোভাযাত্রার কথা শুনেই প্রচণ্ড ভালো লাগার একটি অনুভূতি হলো। বর্ষবরণের শোভাযাত্রায় শেষ গিয়েছিলাম ২০০১ সালে। তাও সিলেটে। ঢাক ও ঢোলের তালে তালে নেচে গেয়ে কত দিন হাঁটা হয় না। সেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বাসন্তী রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবি আর বেলি ও গোলাপ ফুলে একাকার সময়গুলোকে ভুলতেই বসেছিলাম। উপস্থাপকের কথায় মনে হলো ব্রিসবেনে বসেই আজ সেই মেলার আমেজ কিছুটা হলেও ফিরে পাব। প্রতিটি প্রবাসীর কাছে দেশে ফেলে আসা বৈশাখ ও চৈত্রসংক্রান্তির সময়গুলো সোনালি অতীত। স্মৃতিতে ঠাসা। ছোট ছোট বাচ্চারা নেচে গেয়ে শোভাযাত্রায় ঘুরল। আমরাও ঘুরলাম। আমাদের বাবা-মায়ের বয়সী অনেককেও ঘুরতে দেখলাম। আমি জানি অনেক বছর পর তারা এটি করার সুযোগ পেয়েছেন। হাঁটতে হাঁটতে কানে ভাসছে মাকসুদের সেই গান—লেগেছে বাঙালির ঘরে ঘরে একি মাতন দোলা, লেগেছে সুরেরই তালে তালে হৃদয় মাতন দোলা।

কুইন্সল্যান্ড সরকারের মন্ত্রী ড. অ্যান্থনি লেইনহ্যামের সঙ্গে বাংলাদেশি শিশুরাকুইন্সল্যান্ড সরকারের মন্ত্রী ড. অ্যান্থনি লেইনহ্যামের সঙ্গে বাংলাদেশি শিশুরা

এর পরের টানা দুই ঘণ্টা একে একে অনেক মনমাতানো ছোট ছোট পর্ব হয়ে গেল। বাচ্চাদের যেমন খুশি তেমন সাজো থেকে শুরু করে বিস্কুট দৌড় কোনো কিছুই বাদ যায়নি। আমাদের ছয় বছরের মেয়ে রিদা তার এক বান্ধবীকে যেমন খুশি তেমন সাজোতে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখে বলল, বাবা বাংলাদেশি পোশাক অনেক সুন্দর। আজ সাহারকে অনেক সুন্দর লাগছে। আর এক বাচ্চাকে দেখলাম জেলেদের মতো গেঞ্জি পরে হাতে উড়াল জাল নিয়ে মাছ ধরার অভিনয় করছে।

অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, এই শিশুরা বেড়ে উঠছে বাংলাদেশের বাইরে। ভিন্ন সংস্কৃতিতে। ওদের একটি নিজস্ব আকাশ আছে, বাতাস আছে, ভাষা আছে—ঠিক বাংলাদেশে আমাদের যেমনটি ছিল। ওদের এই পথচলার সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির খুব কম মিল আছে। এরপরেও ওদের প্রায় সবাই বাংলায় কথা বলে। বাঙালি পোশাকে সাজতে ভালোবাসে। বাঙালিদের সবচেয়ে বড় প্রাণের মেলায় ওরাও তাই আমাদের সঙ্গে মিলেমিশে উপভোগ করছে। এদের আবহমান বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করাই আমাদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

শোভাযাত্রাশোভাযাত্রা

মেলায় পুরুষ ও নারীদের জন্যও পর্ব ছিল। নারীদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব ছিল উইকেট ভাঙার প্রতিযোগিতা। ক্রিকেট এখন আমাদের জাতীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক সময় ইন্ডিয়ান টিমে একজন বাঙালি, সৌরভ গাঙ্গুলি বিশ্বমানের খেলা খেলতেন। তা নিয়েই আমাদের মধ্যে গর্বের সীমা ছিল না। আর এখন পুরো একটি দল, কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট একটি দলের সবাই বাঙালি। সেই দলে আছে বর্তমান বিশ্বের বোলিং সেনসেশন মুস্তাফিজুর রহমান। সম্ভবত মুস্তাফিজে প্রভাবিত হয়েই অ্যাসোসিয়েশনের কর্তাব্যক্তিরা নারীদের জন্য উইকেট ভাঙার প্রতিযোগিতার পর্বটি রাখলেন। নারীরাও দেখিয়ে দিলেন তারাও কম যান না। পুরুষদের জন্য রশি টানাটানির ইভেন্টটি ছিল প্রাণময় একটি ইভেন্ট। ৬০ বছরের অনেক বড় ভাইকেও দেখলাম রশি ধরে টানা টানি করছেন। আমি নিশ্চিত, তারা এক মুহূর্তের জন্য হলেও তাদের শৈশবের প্রাইমারি স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ফিরে গিয়েছিলেন। কিছুতেই রশি ছাড়া যাবে না, হারা যাবে না!

শোভাযাত্রাশোভাযাত্রা

এবারের মেলায় একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ আমাকে প্রচণ্ড আকৃষ্ট করেছে। কমিউনিটির খুব পরিচিত মুখ ও সংগঠনের সাংস্কৃতিক সম্পাদিকা নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশে অবহেলিত ও অনগ্রসর শিশু কিশোরদের পড়াশোনার সহযোগিতা করার জন্য ডোনেশান বক্স খুলেছেন। সেই ডোনেশানের টাকা তিনি বাংলাদেশের একটি চ্যারিটি সংগঠনের মাধ্যমে অভাবী শিশু কিশোরদের পড়াশোনার জন্য পাঠাবেন। মেলায় আগত কিছু শিশুকে দেখলাম সেই ডোনেশান বাক্সে টাকা ভরছে। দেশের জন্য কিছু করার মুগ্ধতায় উদ্ভাসিত এই শিশুগুলো এভাবেই বেড়ে উঠুক।

ব্রিসবেনের বাংলাদেশিদের কোনো অনুষ্ঠানে এর আগে যেটি কখনো হয়নি সেটি হলো সন্ধ্যার আগে আগে। কুইন্সল্যান্ড সরকারের তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী ড. অ্যান্থনি লেইনহ্যাম মেলায় আসলেন। ব্রিসবেনে বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এটি একটি বড় স্বীকৃতি। এখানে বাংলাদেশি কমিউনিটির বয়স খুব বেশি নয়। প্রায় ২৫ বছর আগে থেকে বাঙালিরা ব্রিসবেনে ইমিগ্রান্ট হতে শুরু করেছে। সবে আমাদের ছেলেমেয়েরা মূলধারার প্রবেশ করেছে। মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন তাদের মনে নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আমরা প্রবাসীরা কত হতভাগা! যে সংস্কৃতিকে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারি না, সে সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় প্রদর্শনে আমরা বাংলাদেশে থাকতে পারি না। ঢাকায় বর্ষবরণের নানান আয়োজনের কথা শুধু পত্রিকা ও টিভিতে দেখে থাকি। অনেক টিভি চ্যানেল হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ নামে খুব জমকালো অনুষ্ঠান করে। ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ছয়টায় চৈত্রসংক্রান্তির অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ চলে ১৪ এপ্রিল সারা দিন। কাজের চাপ ও সময়ের পার্থক্যের কারণে এ সবও দেখা হয়ে ওঠে না। আমার ১৩ বছরের প্রবাস জীবনে বর্ষবরণের ব্রিসবেনের এই উৎসবটিই সেরা উৎসব।

তারপরও কিছু একটার অভাব ছিল বৈকি! বৈশাখ এসেছে, কালবৈশাখী হবে না, সেটা কী হয়? কিন্তু বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, পৃথিবীর এই গোলার্ধের ব্রিসবেনে উন্মাদিনী রুদ্র কালবৈশাখীর দেখা পাওয়াটা হয়তো বেশি চাওয়া। কিন্তু প্রকৃতি আমাদের এখানেও নিরাশ করেনি, বিকেলে বৃষ্টির সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া সবাইকে মনে করে দিয়েছে বাংলাদেশের কথা। মাটির কথা, মায়ের কথা। এলোমেলো ঘূর্ণি হাওয়ায়, ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফিরি।


Link: This article was originally published here

Go to Top