Article
ভাটি অঞ্চলের হুমায়ূন
হুমায়ূন আহমেদ- চির শান্তিতে থেকো
|
ভাটি অঞ্চলের হুমায়ূন

ক্লাস এইটে পড়ার সময় থেকে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষায় রচনা লিখতে হতো। তখন থেকে এসএসসি পর্যন্ত সব পরীক্ষাতেই আমার একটি রচনা কমন পড়তো- “তোমার প্রিয় লেখক”। তখন পর্যন্ত তাঁর মাত্র চার-পাঁচটি লেখা পড়েছিলাম, অনেকটা না বুঝেই তাঁকে নিয়ে লিখতাম। এক বড়ভাইয়ের কাছ থেকে থেকে একটা নোট পেয়েছিলাম তাঁকে নিয়ে লেখা। তখনও তিনি পপুলারিটির চুঁড়ায় ওঠেননি। তবে বাংলা একাডেমির পুরস্কার পেয়েছিলেন।

এক

তাঁর লেখার ভক্ত আমি কখনোই ছিলাম না, তবে পাঠক ছিলাম; পড়তাম। কলেজ, ইউনিভার্সিটি এবং পরবর্তীতে (দেশে থাকাকালীন) প্রকাশিত তাঁর প্রায় সব লেখাই আমি পড়েছি। শুধু মানুষ দেখার, মানুষ চেনার, মানুষ জানার জন্য রঙ-বেরঙের কাজ, নানান নেশা আর স্বপ্নে নিজেকে জড়িয়েছেন। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন করেছেন ওলট পালট। কখনও সেজেছেন মিসির আলী, কখনও হিমু।

তাঁর লেখা সম্পর্কে “গল্পপাঠ” গতবছর এক সংখ্যায় লিখেছিলোঃ

“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ছোটগল্প সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’। আর হুমায়ূন সবার মন জয় করেছেন সহজ কথা সহজভাবে বলতে পেরেই। ছোটগল্পের যে তরী রবীন্দ্রনাথের হাতে সচল হয়েছিল, বিগত প্রায় এক-দেড়শ বছরে; সে তরীর বাঁকবদল ঘটেছে অনেকের হাতে। কিন্তু বাংলা ছোটগল্পকে সম্পূর্ণ নতুন বন্দরে পৌঁছে দেন হুমায়ূন আহমেদ। তিনি গোটা বিশ্বসাহিত্যে সেই লেখক, যাঁর লেখাকে অনেকে অখাদ্য বলে ছুড়ে দিতে পারে, আবার প্রগাঢ় কৌতূহলে হাজার লেখকের ভিড়ে খুঁজে নেয় গভীর ভালোবাসায়। তাই তো তিনি বিশেষ গোষ্ঠীর লেখক নন; বরং তিনি সবার লেখক।”

দুই

তাঁর প্রতিটি সিনেমা, প্রতিটি নাটক আমি অনেকবার করে দেখেছি। একসময় কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক ভর্তি ছিল তাঁর সিনেমা ও নাটকে। তাঁর সিনেমা ও নাটক ভাল লাগার অনেক কারণের মাঝে একটি ছিল- নেত্রকোনার মানুষ, তাঁদের ভাষা ও সংস্কৃতির সরব উপস্থিতি। তাঁর অনেক লেখায় অনেক নাটকে নেত্রকোনার অতিথপুর, মোহনগঞ্জ অঞ্চলের কথা থাকে। মোহনগঞ্জ নেত্রকোনার একটি থানা শহর। এই ভাটির শহরের “শেখ বাড়ি” তাঁর নানা বাড়ি। এই বাড়ির মেয়ে আয়েশা বেগমের বড় ছেলে তিনি।

মোহনগঞ্জ থেকে ১০/১২ কিলোমিটার ভাটিতে আমার নিজের গ্রাম জয়শ্রী। সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা থানায় পড়েছে। জয়শ্রী এবং জয়শ্রীর মতো ভাটির গ্রামগুলো হাওর আর বিল ঘেরা। ছয় মাস জল আর ছয় মাস শুকনো। এখানের মানুষ হাওর আর বিলের সাথে নিজেদের সুখ, আশা ভালোবাসা জড়িয়ে শত শত বছর টিকে আছে।

তাঁর অনেক সিনেমায় ভাটির জমিদারের কথা থাকে। ব্রিটিশ পিরিয়ডে হিন্দু জমিদারদের পাশাপাশি অনেক মুসলিম জমিদার (এবং তালুকদারেরাই) ছিল ভাটির রাজা/নবাব। ব্রিটিশ পিরিয়ডের শেষের দিকে সব হিন্দু জমিদারেরা শহরে বা কলকাতায় চলে গেলেও মুসলিম তালুকদার এবং তাদের বংশধরেরা ভাটিতেই রয়ে গিয়েছিলো। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘চন্দ্রকথা’ অথবা ‘ঘেঁটু পুত্র কমলা’য় আমরা সেসব জমিদারের দেখা পেয়েছি। অয়োময়’তেও দেখেছি।

কংস নদী ভৌগোলিকভাবে ঢাকা এবং সিলেট বিভাগকে আলাদা করলেও নদীর দুই পাশের মোহনগঞ্জ এবং ধর্মপাশার মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আলাদা করতে পারেনি।

বিল ও হাওর ঘেরা এই দুই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি একাকার হয়ে আছে। আমারও নানা বাড়ি মোহনগঞ্জের এক গ্রামে। আমার মায়ের নানাবাড়ি অতিথপুরের পাশের গ্রাম মল্লিকপুরে। আমার শৈশবে অগ্রায়ণে, স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার পর মায়ের সাথে মল্লিকপুর যেতাম। টানা ১৫/২০ দিন থেকে আসতাম।
মল্লিকপুর থেকে অতিথপুর রেলস্টেশন দেখা যেতো। অতিথপুর স্টেশন ঘিরে শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে (মল্লিকপুর, অতিথপুর, অতিথপুর রেলস্টেশনের কথা মনে হলেই চোখ ঝাপসা হয়ে যায়)। তখনও বিভূতিভূষনের ‘পথের পাঁচালি’র সাথে আমার পরিচয় হয়নি। অপু দূর্গার দূরাগত ট্রেনের বাঁশি শুনার দৃশ্য তখনও পড়া বা দেখা হয়নি। কিন্তু প্রায়ই বাড়িতে না বলে অতিথপুর স্টেশানে শাহাজাহানকে (আমার মামাতো ভাই) নিয়ে যেতাম, ট্রেন দেখবো বলে। এই অতিথপুরকে ঘিরে হুমায়ূনের অনেকগুলো চমৎকার লেখা আছে।

তাঁর দাদা বাড়ি নেত্রকোনার কেন্দুয়ায়, কুতুবপুরে। কুতুবপুর থেকে পুবের দিকে গেলেই আবারও সেই হাওর অঞ্চল। ইটনা, পাঁচহাট, শহিলা- ভাটির এলাকা। এই কুতুবপুরেই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ তাঁর পিতা ফজলুর রহমান আহমেদের স্মৃতিকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত “শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ”।

আজ তাঁর প্রয়াণ দিবস।
হুমায়ূন আহমেদ- চির শান্তিতে থেকো।


Link: This article was originally published here

Go to Top