Article
ব্রিসবেনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও গণহত্যা বিষয়ক মতবিনিময়
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও গণহত্যা বিষয়ক মতবিনিময়
|
ব্রিসবেনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও গণহত্যা বিষয়ক মতবিনিময়

এই কিছুদিন আগের ঘটনা। এক বাসায় দাওয়াত খেতে গেলাম। বিদেশে বসবাসরত কয়েকজন বাঙালি একসঙ্গে হলে যা হয়—অবধারিতভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ক্রিকেট নিয়ে কথা শুরু হলো। একজনকে দেখলাম খুব বড় গলায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কথা বলছেন। তিনি বারবার বলছেন, ‘মুজিব’। এমন নয় যে এইভাবে নামটা বলা যাবে না। তবে তার বলার মাঝে কেমন যেন একটা ঘৃণা ও অবজ্ঞা মেশানো ছিল। কথার এক প্রসঙ্গে তিনি বলে যাচ্ছিলেন—খন্দকার মোশতাক বাংলাদেশের একজন সিংহ পুরুষ। মুজিবকে মেরে সে বাঘের বাচ্চার কাজ করেছে।

কয়েক দিন আগের আরেক ঘটনা। বাংলাদেশের এক ছাত্র অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি করতে এসেছে। সে তার সহপাঠী আরেক বাংলাদেশি ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেছে—তোমার দেশে একাত্তরের যুদ্ধে কতজন মারা গেছে? (খেয়াল করবেন, সে বলেছে তোমার দেশে। তার মানে বাংলাদেশ নামক দেশটা তার না) উত্তরের অপেক্ষা না করে সে তার মোবাইলের ক্যালকুলেটরে হিসাব করতে করতে বলল, ধরো, তোমাদের মুজিবের কথামতো ৩০ লাখ মারা গেল, তাহলে ৩০ লাখকে ৬৪ দিয়ে ভাগ করো, প্রতি জেলায় কতজন মারা গেছে তার একটা সংখ্যা তুমি পাবে। এখন এ সংখ্যাকে প্রথমে উপজেলা তারপর গ্রামের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করে প্রতি গ্রামে কতজন মারা গেছে তার আনুমানিক একটা সংখ্যা পাবে। এভাবে তুমি ২ লাখ রেপের সংখ্যা থেকেও প্রতি গ্রামে রেপের সংখ্যাটা বের করতে পারবে। এখন তুমি কি প্রমাণ দিতে পারবে, তোমার গ্রামে এত সংখ্যক মানুষ একাত্তরে মারা গেছে? রেপ হয়েছে?

মতবিনিময়ের দৃশ্যমতবিনিময়ের দৃশ্য

গত এক যুগের বিদেশ জীবনে এমন ঘটনা প্রায় প্রতিনিয়তই শুনে আসছি। একাত্তরের স্বাধীনতা বিরোধীদের আত্মীয়স্বজন ও তাদের অনুসারীরাতো আছেই। এদের সঙ্গে আরেকটি শ্রেণিও এই অপপ্রচারগুলো খুব সুচারুভাবে করে যাচ্ছেন। এই শ্রেণিটির বেশির ভাগের বয়স ৪৫ থেকে ৫০-এর মধ্যে। ৮০ ও ৯০-এর দশকে এরা বাংলাদেশে বেড়ে উঠেছেন। একসময় এরা বাংলাদেশ সেরা ছাত্রছাত্রী ছিলেন। এসএসসি-এইচএসসিতে তাদের ছবি বাংলাদেশের মূলধারার সবগুলো পত্রপত্রিকাতেই একাধিক বার ছাপানোও হয়েছিল। কোদাল আর ঝুড়ি পাশে রেখে চোখে কালো চশমা সাদা টিশার্ট পড়া এক ছবি দিয়ে বিখ্যাত হওয়া এক প্রেসিডেন্ট এই মেধাবীদের ব্রেনওয়াশ ভালো মতোই করে গিয়েছেন। তিনি তাঁর প্রেসিডেন্সির সময়ে প্রতিটি বোর্ডে মেধাস্থান অধিকারীদের নিয়ে বঙ্গোপসাগরে শিক্ষা ভ্রমণে গিয়েছিলেন। সদ্য কিশোর একটি ছেলে যে কিনা দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর মানুষটির সঙ্গে খেয়েছে, কথা বলেছে, ভাব বিনিময় করেছে, গুরুত্ব পেয়েছে, সেই ছেলেটি পরবর্তী জীবনে কীভাবে এই প্রেসিডেন্টের নীতির বিরোধিতা করবে? ইদানীং এদের অপপ্রচারের একটি ট্রেন্ড আমি খেয়াল করেছি। এরা প্রথমে সরকারের বিভিন্ন কাজের বিরোধিতা করে। পরবর্তী ধাপে এরা বঙ্গবন্ধুকে বিরোধিতা করে, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে, তাঁর পরিবার নিয়ে, রাজনৈতিক জীবন নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ায়। সেই বিরোধিতার ধারাবাহিকতায় এরা এক সময় বাংলাদেশেরও বিরোধিতা শুরু করে। দেশের মুক্তিযুদ্ধের সকল কৃতিত্বকে খাটো করে দেখে। ইতিহাসকে বিকৃত করে।

ইতিহাস বিকৃতির এই ধারা আজ থেকে নয়। ’৭৫-এর পরবর্তীতে রাজনৈতিক ইঞ্জিনিয়ারিং এত সুকৌশলে করা হয়েছে যে একটি প্রজন্ম স্বাধীনতার বিকৃত ইতিহাসকেই সঠিক ইতিহাস মনে করে। ’৭৫-এর পরে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ওপর এক ফিল্টার বসিয়ে দেওয়া হলো। সে ফিল্টার ভেদ করে যা মিথ্যে তাই রেডিও টেলিভিশন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতো। যা বিভ্রান্তি ছড়াবে তাই ছাড়পত্র পেত।
এই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাশাপাশি ছিল রাজনীতিকে মেধাশূন্য করার আরেক সুকৌশলী পদক্ষেপ। আমরা যখন স্কুল-কলেজে পড়ি তখন শুনেছি রাজনীতি হলো মাস্তানদের কাজ। যারা ক্লাসে শেষ বেঞ্চে বসবে, যারা মারামারি চাঁদাবাজি করবে রাজনীতি তাদের জন্য। বুঝে হোক না বুঝে হোক আমাদের মান্যবর শিক্ষকেরাও এই ধারণাই প্রচার করেছেন। রেডিও টেলিভিশনে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, রাজনীতি ভালো ছেলেমেয়দের জন্য নয়। তারা পত্রিকার পাতায় বড় বড় কলাম লিখেছেন। ভালো ছাত্রছাত্রীরা মুখ বুঝে বই পড়বে। আর বখাটেরা রাজনীতি করবে, অস্ত্র হাতে নেতাদের পেছনে ঘুরবে।
আর তাদের চেষ্টাকেও সমর্থন দিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও অভি-নীরুরা সৃষ্ট করেছিল এক নতুন যুগের। গোলাগুলি ছাত্র খুন নিয়মিত ব্যাপার ছিলই। এর ফলস্বরূপ যা হওয়ার তাই হয়েছে। আমাদের রাজনীতি এখন দুর্বৃত্তদের দখলে। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি সব দলেই এখন এই দুর্বৃত্তদের পাল্লা ভারী। এদের বেশির ভাগের কাছে দেশের চেয়ে দল বড়। দলের চেয়েও দলের নেতা বড়। দেশ ও আদর্শ এদের কাছে খুব তুচ্ছ ব্যাপার। নিজের হীনস্বার্থের জন্য এরা যেকোনো কাজ করতে পারে।

মতবিনিময়ের দৃশ্যমতবিনিময়ের দৃশ্য

এইতো কয়েক দিন আগে বরিশালের এক আওয়ামী লীগ নেতা স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করে ছাপা হয়েছে অভিযোগ এনে এক উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিরুদ্ধে মামলা করে তাঁকে জেল হাজতে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিশুদের জন্য একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী তিনি সেখান থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় হওয়া দুটি ছবি নিয়ে স্বাধীনতা স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র ছাপিয়েছেন। একটি শিশু তার মতো করেই বঙ্গবন্ধুকে এঁকেছে। একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কোথায় তিনি সেটি সমর্থন করবেন, শিশুদের উৎসাহিত করবেন তা না, উল্টো তার অনুভূতিতে আঘাত লেগে গেছে। বঙ্গবন্ধুর ছবি যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিশু আঁকতে না পারে তার জন্য একটি পাকা ব্যবস্থা করার চেষ্টা চালিয়েছেন। পত্রিকায় দেখলাম এই নেতা মাত্র পাঁচ বছর আগেও আওয়ামী লীগ করতেন না। আমি নিশ্চিত আরও খোঁজ নিয়ে জানা যাবে সে হয়তো আওয়ামী লিগের একটি মূল নীতিও জানে না। এই রকম অনুভূতিওয়ালা নব্য আওয়ামী লীগাররাও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ইচ্ছেমতো বিকৃত করে চলছে।

এর পরেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ১৯৯০ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম মাত্র কয়েক হাজার জনতা নিয়ে যে ডাক দিয়ে গিয়েছিলেন, ২০১৩ সালে এসে সেটি লাখো জনতার ডাকে রূপ নিয়েছিল। সেদিন ঢাকার রাজপথে নেমে আসা লাখো জনতার মাঝে বেশির ভাগেই ছিল এই প্রজন্মের ছেলেমেয়ে। গোলাম আযম, নিজামী, সাকা চৌধুরী, কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উঠেছে এদের অন্তর থেকে। শুধু ঢাকায় নয়, দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে গণজাগরণ মঞ্চ হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের এই দাবি শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে যেখানেই বাংলাদেশি আছে সেখানেই এই দাবি উঠেছে। কিছুদিন আগে পত্রিকায় দেখেছিলাম, পাকিস্তানের কিছু তরুণ দাবি তুলেছে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরারা একাত্তরে যে নারকীয় গণহত্যা চালিয়েছিল তার জন্য তাদের সরকারকে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। এ দাবিটি আমাদের উঠতে-বসতে করা দরকার। সব আন্তর্জাতিক ফোরামে এ দাবিটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব সময় তোলা উচিত। সেই সঙ্গে পাকিস্তানের কীর্তিকলাপের বর্ণনাও দেওয়া উচিত। এগুলো যত বেশি বেশি করা হবে, ততই বিশ্ব জানবে পাকিস্তান ১৯৭১ সালে কি করেছিল। ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানকে এটা বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে।

দুই

মতবিনিময়ের দৃশ্যমতবিনিময়ের দৃশ্য

গত ৯ থেকে ১৩ জুলাই অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডে হয়ে গেল ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলারসের ১৩তম সম্মেলন। ‘গণহত্যা প্রতিরোধ ও ন্যায়বিচার’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে নিয়ে আয়োজিত এই সম্মেলনে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা আইনজ্ঞ ও গবেষকদের ভেতরে অন্যতম ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম স্ট্র্যাটেজি ফোরামের (আইসিএসএফ) প্রতিনিধিত্বকারী চারজন বাংলাদেশি আইন গবেষক—ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন, ড. রায়হান রশিদ, ব্যারিস্টার শাহ আলী ফরহাদ ও এম সানজিব হোসেন। আইসিএসএফ বিভিন্ন প্রগতিশীল ব্লগ ও সংগঠনের সঙ্গে সঙ্গে একঝাঁক মেধাবী শিক্ষক, গবেষক ও আইনজ্ঞদের নিয়ে গড়া একটি স্বাধীন বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক। যাদের মূল লক্ষ্য হলো, বিভিন্ন গণহত্যা, আন্তর্জাতিক অপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ কিংবা যুদ্ধাপরাধের বিচার ও প্রতিরোধে শক্তভাবে কাজ করা। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সংগঠন হলেও, আইসিএসএফ আমদের কাছে পরিচিত ২০০৯ সাল থেকে। যখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া ভয়ংকর গণহত্যা আর নির্যাতনের জন্য দায়ী অভিযুক্তদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে দিন রাত সংগঠনটি মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল জোগাড় করেছেন। অনলাইনে সোচ্চার থেকেছেন রাজাকারদের মনগড়া ইতিহাসকে প্রতিহত করতে। পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা যখনই বিভিন্ন সম্মেলন, মিডিয়া কিংবা ভাড়া করা লবিস্ট নিয়ে এই বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়েছ, আইসিএসএফ বিভিন্ন মাধ্যমে, তথ্য ও প্রমাণসহ তাদের কড়া জবাব দিয়েছে।

কনফারেন্স সুবাদে এই চারজন সমৃদ্ধ ব্যক্তি ব্রিসবেনে আসলেও তারা এখানকার প্রবাসী বাঙালিদের সঙ্গে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেন। ব্রিসবেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন, ব্রিসবেন বাংলা রেডিও ও ব্রিসবেন বাংলা স্কুল যৌথভাবে খুব কম সময়ের ভেতরেই তাঁদের নিয়ে ব্রিসবেনের এলেন গ্রোভ ইউনিটিং চার্চে গত ১৪ জুলাই সন্ধ্যায় একটি মতবিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই আয়োজনের পেছনে ব্রিসবেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান শামিমের ভূমিকা সত্যি প্রশংসার দাবিদার।

ঘরোয়া একটা পরিবেশে সেখানে জড়ো হন সব বয়সের, আর শ্রেণি পেশার প্রবাসী বাংলাদেশিরা। আগত অতিথিরা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম স্ট্র্যাটেজি ফোরামে কাজ করতে গিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গণহত্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গির কথা, কীভাবে এই কাজে প্রবাসী বাংলাদেশিরা সম্পৃক্ত হতে পারি, তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।

ব্রিসবেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিকাশ শিকদার ও ব্রিসবেন বাংলা স্কুলের সভাপতি মাহি মোর্শেদ অনুর যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠান শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই একটা গভীর নীরবতা নেমে আসে। ব্রিসবেনে আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম, যারা বেড়ে উঠেছে অন্য এক আলো বাতাসে, সেই সব নবীনদের চোখের কোণেও জল এসে পড়ে। কারণটা ছিল সংগত। শুরুতেই আইসিএসএফ থেকে নির্মিত ‘1971 Genocide: A Creed for Justice’ নামে একটা ডকুমেন্টারি দেখানো হয়। মূল্যবান রেফারেন্স আর গ্রহণযোগ্য উপাত্তসহ প্রদর্শিত এই ডকুমেন্টারি দেখে কান্না চেপে রাখা দুঃসাধ্য কাজ ছিল। ডকুমেন্টারিতে এন্ডি রো-এর ইংরেজি ধারাভাষ্যের কারণটাও ছিল স্পষ্ট—আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের জেনোসাইডকে জানান দেওয়ার জন্য।

অতিথি ড. রায়হান রশিদও এ বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, আমার যারা ৩০ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের মূল্যে পাওয়া স্বাধীনতাকে বুকে লালন করি, তাদের ভেতরে একটা আবেগ কাজ করে। তাই আমরা এই যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে সোচ্চার, কিন্তু নতুন প্রজন্ম কিংবা আজ থেকে এক শ বছর পরে যারা পৃথিবীতে আসবে তাদের ভেতর এই অনুভূতিটা নাও থাকতে পারে। তিনি মনে করিয়ে দেন, স্বাধীনতা বিরোধীরা তথ্য বিভ্রাট ও বিকৃতির মাধ্যমে বিশ্বের সামনে বাংলাদেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কাজে তৎপর। গুগলে খুঁজলেই অনেক ভুল তথ্য আমাদের সামনে চলে আসে। এর পেছনে কাজ করছে বাংলাদেশ বিরোধীদের কোটি কোটি টাঁকার কু-বিনিয়োগ। তাদের নিয়োজিত বড় বড় সব পিআর আর লবিস্ট প্রতিষ্ঠানগুলো উঠে পড়ে লেগেছে এই বিচারকে বন্ধ করতে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংগঠন, ইকোনমিস্টের মতো পত্রিকাকে তারা প্রভাবিত করে ফেলেছে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো আমাদের পরের প্রজন্মগুলো একসময় প্রভাবিত হয়ে সঠিক ইতিহাস নিয়ে সংশয়ে থাকবে।

ড. রশিদের মতে, এই ঘৃণ্য শুক্তিকে শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে মোকাবিলা করলে চলবে না। গবেষণা আর উপাত্ত প্রসূত দলিল নিয়ে জবাব দিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন এবং অফলাইনকে সঠিক প্রামাণ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করতে হবে যাতে বঙ্গবন্ধুর এই বাংলায় আজ থেকে হাজার বছর পরেও কেউ বিভ্রান্ত না হয়।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও গণহত্যা বিষয়ক দলিলপত্রের প্রদর্শনীমুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও গণহত্যা বিষয়ক দলিলপত্রের প্রদর্শনী

ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন একজন প্রথিতযশা আইন গবেষক। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে পারাটা ছিল আমাদের জন্য একটা বড় পাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুটতরাজ, ধর্মান্তরের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিতে আহমেদ জিয়াউদ্দিনের গবেষণা ও নির্দেশনার একটা বড় ভূমিকা আছে। তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, দেশে বিদেশে রাজাকারদের বংশধরদের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা, উপায়ন্তরে বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তান বানানোর ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে, কেন ‘জেনোসাইড ডিনাইল ল’-এর জন্য কাজ করছেন না, যেখানে জার্মানির মতো রাষ্ট্রে এই আইন রয়েছে?

ব্যাপারটার একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পেলাম। তাঁর মতে, জার্মানির স্কুল থেকে শুরু করে সব জায়গাতেই ইতিহাস সম্পর্কে একটা পোক্ত ধারণা দিয়ে দেওয়া হয়। তাদের ভেতর খুব কম মানুষই আছে যারা ভুল ইতিহাস দিয়ে অন্যকে বিভ্রান্ত করে। সেখানকার শতভাগ মানুষের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের একটা কাছে সঠিক ইতিহাস পৌঁছে দিয়েই এই আইনটি কার্যকর করা হয়েছে। অন্যদিকে, দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশে এখনো সরকার বদলে গেলে ইতিহাসের বই পরিবর্তন হয়, ধর্মকে পুঁজি করে ভুল দীক্ষা গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের আধুনিক ছেলেমেয়েটির মাথাতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এই অবস্থাতে এ রকম কোনো আইন পাস করলে তার অপব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। তিনি আরও যোগ করেন, এ ধরনের আইন অবশ্যই দরকার, তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগে সবার কাছে বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস পৌঁছে দিতে হবে, মৌলিক বিষয়গুলোকে জানাতে হবে, ধর্মভিত্তিক চরমপন্থী রাজনীতি বন্ধ করতে হবে।

দলের অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার শাহ আলী ফরহাদ, কীভাবে এই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা যায় সেটা জানালেন। তিনি অনেক আশার কথা শোনালেন, কীভাবে বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম যুক্ত হচ্ছে, সেখানে মাসে একটা করে মুক্তিযুদ্ধের ছবি প্রদর্শন হচ্ছে, খোলামেলা আলোচনার একপর্যায়ে ব্যারিস্টার ফরহাদের আরেকটি কথা বেশ মনে ধরল। তিনি জানালেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে কি হলিউডের কোনো মুভি বানানো যায় না? যার মাধ্যমে বাংলাদেশের পাকিস্তানি গণহত্যার কথা পৌঁছে যাবে পৃথিবীর আনাচকানাচে।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে স্বাধীনতার মাত্র ৪৭ বছরে এসেই আমরা আজ রাজাকারদের বিচার নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। মানব ইতিহাসে নজিরবিহীন পাকিস্তান ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদরদের গণহত্যা ও নির্যাতনের কলঙ্কজনক অধ্যায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে নামীদামি মিডিয়া, সংগঠন আর তথাকথিত অনেক উন্নত অনেক দেশ। কিন্তু আমাদের বসে থাকলে চলবে না। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তার সহায়ক বাহিনীসমূহ বাংলাদেশের জনসাধারণের যে গণহত্যা চালিয়েছে তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আজকের প্রেক্ষাপটে অনেক জরুরি। এই স্বীকৃতি লাখো আত্মত্যাগীর আত্মাকেই শুধু শান্তি দেবে না, ভবিষ্যতে এমন নৃশংসতার পুনরাবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের বিশ্বব্যাপী কর্মসূচিকে আরও জোরদার করার জন্য আইসিএসএফ যে কাজ শুরু করেছে সেটি এগিয়ে নিতে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি আছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্তের স্বার্থে ভারতের কাছে মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত যে সকল সামরিক দলিল ও নথিপত্র রয়েছে তা অবমুক্ত করে বাংলাদেশে আনতে হবে। ১৯৭১ সালে সংঘটিত নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু তাই নয় প্রবাসী বাঙালিরা যার যার অবস্থান থেকে এই বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে সেখানকার পার্লামেন্টে তুলতে পারেন।

মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর সংরক্ষণের পাশাপাশি, বিভিন্ন বুদ্ধিভিত্তিক উন্নয়ন যেমন মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত সকল দলিল সংরক্ষণ, ডিজিটাইজ, ও বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। মনের ভেতর অনেক শঙ্কা থাকলেও ড. জিয়াউদ্দিন, ড. রশিদ কিংবা ব্যারিস্টার ফরহাদের কথাগুলো আমাদের আশাবাদী করে। অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে তখন প্রায় রাত প্রায় ১১টা। মনের ভেতর অন্যরকম এক তাগিদ অনুভব করি, না! বাড়ি ফেরার তাগিদ নয়। দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ। যাদের রক্তে রঞ্জিত আমাদের এই লাল সবুজের পতাকা, তাদেরকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দেওয়ার তাগিদ| আগত প্রজন্মকে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধুর অবদান এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস দেওয়ার তাগিদ…।


Link: This article was originally published here

Go to Top