Article
শুধু মানুষ খুঁজে ফিরি
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ
|
শুধু মানুষ খুঁজে ফিরি

বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অনুচ্ছেদের ২৮-এর ১ ধারাতে বলা আছে_ ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না।’ বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই শ্রেণির সবচেয়ে বড় অংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতি ও ভাষাভিত্তিক সংখ্যালঘু সম্প্র্রদায়, যেমন আদিবাসীরা। সবচেয়ে মন খারাপের বিষয় হলো, নিষ্পেষিত হতে হতে এই সম্প্র্রদায়ের মানুষ নিজেরাও মনেপ্রাণে নিজেদের সংখ্যালঘু হিসেবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। আর তারা করবেই না কেন? তাদের নিরাপত্তা দিতে প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ রাজনৈতিক নেতা, আইন প্রণেতা সবাই কমবেশি ব্যর্থ।

নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ এবং সেখানকার প্রশাসনের নির্লিপ্ততা_ সবকিছু ঘটেছে অসাম্প্র্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের ম্যান্ডেট নিয়ে আসা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। যে সরকারের নেতৃত্বে প্রবল প্রতাপশালী যুদ্ধাপরাধী সব মোড়লকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে, সে সরকারের আমলে এমন ঘটনা আমাদের মতো সাধারণ নাগরিককে বিভ্রান্ত করে। আমরা হতাশ হই।

একটা প্রশ্ন ইদানীং প্রায়ই মনে আসে, সেই ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর, বিএনপি-জামায়াত জোটের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্মম সহিংসতা হয়েছিল, শাহরিয়ার কবিরের এক শ্বেতপত্রেই উঠে এসেছে ৩ হাজারের মতো সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা। সেই ঘটনার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ দুর্বার আন্দোলন করে; বিভিন্ন সাংস্কৃতিক জোট মাঠে নামে। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগের আমল। নাসিরনগরে দেবালয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হলো। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এসবের জন্য কোনো প্রতিকারের উদ্যোগ তো নেওয়া হয়ইনি; উল্টো আওয়ামী সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী এ ঘটনার জন্য হিন্দু সম্প্র্রদায়ের নেতাদের মালাউন বলে গালাগাল করলেন। এসব দেখে হতবিহ্বল হয়ে ভাবি, সেই পুরোটা বিক্ষোভই কি ছিল সংখ্যালঘুদের ভোট পাওয়ার রাজনীতি? আরেকটি প্রশ্ন আমাদের নিয়ে। হ্যাঁ, নিজেদের নিয়ে। আমরা কি আমাদের জায়গা থেকে ঘটনাগুলোর প্রতিবাদ করেছি? না, করিনি। আমরা কেন এক কাতারে দাঁড়িয়ে, যেখানেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, তথা মানবতা বিপর্যস্ত হয়, সেখানেই কেন প্রতিবাদ জানাতে পারি না? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর কী হবে_ আমাদের অনেকেরই জানা নেই। তবে এর পরিণাম আমরা কিছুটা আন্দাজ করতে পারি। দেশ, সমাজ ও মানুষের চাইতে ধর্ম ও রাজনীতি যখন বড় হয়ে যায়, তখন ধর্মও যেমন টেকে না, সমাজও টেকে না। ধর্মীয় প্ররোচনায় হোক, রাজনীতির প্ররোচনায় হোক; সমাজ যদি একবার ভেঙে যায়, তাহলে হিন্দু-মুসলমানের ভ্রাতৃত্বটুকু আর থাকে না। কিন্তু দেশের উন্নতি, কল্যাণের জন্য এই ভ্রাতৃত্বটুকু আমাদের খুব জরুরি দরকার।

অন্য অঞ্চলের খবর জানি না; আমাদের ছেলেবেলায় সুনামগঞ্জের ভাটির গ্রামগুলোতে হিন্দু-মুসলমানের এক মধুর ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। পূজায় যেমন আমরা দল বেঁধে দাওয়াতে যেতাম, ঈদেও আমাদের বন্ধুরা মুসলিমপাড়া চষে বেড়াত। চৈত্রসংক্রান্তিতে জয়শ্রীতে বারুণী মেলা হতো। এ যেন হিন্দু-মুসলমানের এক মিলন মেলা। আমার এখনও চোখে ভাসে, সে মেলায় হিন্দুপাড়ায় তো আছেই, আমাদের মুসলিমপাড়াতেও নাইওরির ধুম লেগে যেত। এলাকার মেয়ে অন্য গ্রামে বিয়ে হয়েছে। বারুণী উপলক্ষে জামাই-সন্তানসহ বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসত। বাড়িতে বিয়ে লেগেছে_ হিন্দুপাড়া থেকে কীর্তনের দল আসত। বর্ষায় হিন্দু-মুসলমান দল বেঁধে সিরাজউদ্দৌলা নাটক করত। জয়শ্রীর বৌলাই নদীতে নৌকাবাইচের সময়ের হিন্দু-মুসলমানের ভ্রাতৃত্বের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোথাও এখনও চোখে পড়েনি। আমাদের সেই ছেলেবেলায় ভুলেও কিন্তু হিন্দু নির্যাতনের কথা শুনিনি।

নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হয়ে সংখ্যালঘুরা বাপ-দাদার ভিটে ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেছে। দেশত্যাগের এ মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তারা পার্শ্বর্বর্তী দেশ ভারতেই বেশি যাচ্ছে। এর মাঝে যাদের সামর্থ্য আছে, যারা পড়াশোনা করেছেন তারা আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া-কানাডায় স্থায়ীভাবে ইমিগ্রেশন নিয়ে চলে যাচ্ছে। তাই বলে নাড়ির বন্ধন কি একেবারে ছেঁড়া যায়? এ বন্ধন ছেঁড়া যে কত কষ্টের, তা আমি নিজে প্রবাসী বলে কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারি। নিজেকে শিকড়হীন, পরগাছা মনে হয়। যে আকাশ-বাতাস, নদী, খেয়াঘাটে তাদের শৈশব কেটেছে, কয়েক দিনের ব্যবধানে তা আর তাদের থাকে না। কখনোই তারা আর সেখানে ফিরে যায় না। এর পরও কি জন্মভূমির দুর্দশার কথা শুনে তারা চুপ করে থাকতে পারে? আমি হিন্দু সম্প্র্রদায়ের অনেক মানুষকে চিনি, যারা ঘুম থেকে উঠে সবার আগে দেশের পত্রিকায় চোখ বুলায়। ভালো-মন্দ খবর একবার দেখে নেয়। দেশের দুঃখের দিনে তাদেরকে কাঁদতেও দেখেছি। বেদনায় মুষড়ে যেতে দেখেছি । দেশের সুদিনে তাদের উচ্ছ্বাসভরা হাসিও দেখেছি। কিন্তু নাসিরনগরে যখন হামলা হয়, তখন ওদের চোখ-মুখপানে তাকাতে আমার কষ্ট হয়। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়।

ফেসবুকের কল্যাণে আমরা এখন জানি_ নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর হামলা, গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের হত্যা-পরবর্তী অনেক প্রতিবাদ হয়েছে দেশ-বিদেশে। ২৭ নভেম্বর সিডনিতে বিশাল প্রতিবাদ সভার ভিডিও দেখলাম। আমাদের ব্রিসবেনেও গত ২০ নভেম্বর রোববার এমন এক সভায় গিয়েছিলাম। আয়োজন করেছিল স্থানীয় পূজা উদযাপন পরিষদ। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাজীব রানার সঞ্চালনায় কমিটির নেতৃত্বস্থানীয়দের মধ্য থেকে প্রথমে সভাপতি দেবদাস গুহ, পরে অধ্যাপক তপন সাহা নাসিরনগরের ঘটনার বর্ণনাসহ তাদের দাবি-দাওয়ার কথা উপস্থিত সবাইকে বলেন। এর পর অনেকের মধ্যে ব্রিসবেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শামসুল আরেফিন ভুঁঁইয়া এবং সাংস্কৃতিক সম্পাদক তুলি নূর, অধ্যাপক আলাউদ্দিন, শাহেদ সাদরুদ্দীন প্রমুখ তাদের ব্যক্তিগত ক্ষোভ, রাগ ও প্রতিবাদের কথা বলেন। আমি খুব ভয়ে ভয়ে চারদিকে ফ্যাকাসে বিমর্ষ মুখগুলোর দিকে তাকাচ্ছিলাম। এরা নিতান্ত সাধারণ ভালোমানুষ। পূজা-ঈদে এরা এখনও দল বেঁধে দেশে যায়। বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা এখনও এদের সবচেয়ে বড় আবেগের স্থান। দেশে রেখে আসা মা-বাবা, ভাইবোনের নিরাপত্তার জন্য এদের চোখেমুখে যে ভয়ের ছাপ দেখেছি; মন্ত্রী, ইউএনও ও লোকাল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে দৃঢ় প্রতিবাদ দেখেছি, তা আমি এর আগে কখনও কোথাও দেখিনি। একজন তো সরাসরি আমাকে প্রশ্নই করে বসলেন_ আওয়ামী লীগের জন্য এত কিছু করে এসেছি, সেই আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে প্রকাশ্যে যেটি ঘটেনি তা কীভাবে ঘটিয়ে বসলেন? কোন সাহসে জনসমক্ষে হিন্দু সম্প্র্রদায়কে ‘মালাউন’ বলে গালি দিলেন? যে ইউএনও আমাদের টাকায় চলেন, তিনি কোন সাহসে সাংবাদিকদের হুমকি দিলেন? আমি নির্লিপ্তভাবে তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। খুব ইচ্ছা হচ্ছিল তার ছলছল করা চোখের পানি মুছে দিতে। কারণ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তো আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।

আমার এক বন্ধু কানাডা থেকে এক লাইনের একটি মেসেজ দিল। ‘বন্ধু, আমি আজ থেকে মালাউন হয়ে গেলাম।’ আমি লজ্জা-অপমানে অনেকক্ষণ কেঁদেছি। আমার এই বন্ধুটি তার ফেসবুক প্রোফাইল পিকচারে ‘আমি মালাউন’ ছবি দিয়ে রেখেছে। আমি তাকে ছোটকাল থেকে চিনি। তার কাছে ধর্ম কখনোই বড় বিষয় ছিল না। কোনোদিন তেমন ধর্ম-অনুষ্ঠান করত না। তার কাছে পূজা যেমন ঈদও তেমন_ দুটিই আনন্দের উৎসব। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নীতি, সততা, আদর্শই ছিল তার সব। আজ তাকে আমরা জোর করে মালাউন বানিয়ে দিলাম! আমি জানি, তার এ অভিমানও একদিন থাকবে না। কিন্তু তার এই ক্ষত কি শুকাবে? তাকে দেওয়া মালাউন গালি সে কীভাবে ভুলবে? যখন তাদের স্বজনের ভিটেটুকু কেড়ে নেওয়া হয়, সে আর্তনাদ কি তার কানে পেঁৗছাবে না? আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ভয়ঙ্কর অন্ধকার ঘিরে ধরে আমাকে। আমি কাঁদি। জগৎজ্যোতি কাঁদে, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কাঁদে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের রূপকার ঘুমিয়ে থাকা মুজিব কাঁদে।


Link: This article was originally published here

Go to Top